সৈনিক – যুদ্ধের নয়, ভালোবাসার

আয়তনের নিরিখে ভারতবর্ষ গ্রিনল্যান্ডের চেয়ে প্রায় দেড় গুণ বড়। তবু, ভারতের মানচিত্রের পিঠে গ্রিনল্যান্ডের মানচিত্র বসালে, যতটা জায়গা নিয়ে থাকবে গ্রিনল্যান্ড, তাও নেহাত কম নয়। এতটা অঞ্চল জুড়ে সে দেশে থাকেন মাত্র ৫৬০০০ মানুষ। জনবসতি বাদ দিলে, দেশের প্রায় ৮০%-ই বনভূমি। বরফে ঢাকা দিগন্তবিস্তৃত প্রান্তর। মেরুপ্রাদেশিক এবং সামুদ্রিক জীববৈচিত্র্যের আকর সেইসব জল ও জমি। জলবায়ুর ব্যাপক হারে পরিবর্তনের যুগে গ্রিনল্যান্ডের পরিবেশ একপ্রকার 'gold dust'-ই, বলা চলে। 

আমেরিকা হাত বাড়াচ্ছে সেদিকে। প্রেসিডেন্ট-বাহাদুর বলছেন, তিনি গ্রিনল্যান্ড নিতে চান জাতীয় সুরক্ষা পোক্ত করতে। গ্রিনল্যান্ডের জনশূন্য প্রান্তরে মিলিটারি বেস প্রস্তুতির আড়ালে যে আমেরিকা হাত বাড়াবে গ্রিনল্যান্ডের প্রাকৃতিক ও খনিজ সম্পদের অফুরান ভাঁড়ারের দিকে, বা উষ্ণায়নে গলে যাওয়া মেরু-বরফের সুযোগ নিয়ে গ্রিনল্যান্ডের আশেপাশের সমুদ্রাঞ্চল বরাবর ট্রেডিং বা শিপিং রুট গড়ে তোলার চেষ্টা করবে সে, এ কথা কে না জানে। 

যেমন হয়েছে আমাদের আরাবল্লীর সঙ্গেও। মাইনিং মাফিয়া, স্থানীয় কন্ট্রাক্টর আর সরকারের আঁতাতের ত্রহস্পর্শে আরাবল্লীর বিরাট অঞ্চল বিধ্বস্ত। জীববৈচিত্র্য নষ্ট, মরুভূমির প্রত্যুত্তর নষ্ট, মাটির সহ্যশক্তি নষ্ট, মাটির তলার জল নষ্ট, ধুলোর প্রকোপে বাতাস নষ্ট। আইনের ফাঁক চমৎকার ভাবে তৈরি করেছে স্বয়ং শীর্ষ আদালতই। পাহাড়ের পাদদেশ থেকে ১০০ মিটার উচ্চতা অবধি জমিজমা আরাবল্লীর অংশ নয়, আর ১০০ মিটারের উপর থেকে আরাবল্লী – তাই উপরটা সুরক্ষিত থাকবে, আর নীচে রাম-রাবণের যুদ্ধ হোক, এ এক দারুণ রায়। আমার মাথা থেকে কোমর অবধি ইন্স্যুরেন্স আছে, কোমর থেকে নীচ অবধি ইন্স্যুরেন্স নেই শুধু তাইই নয়, লোকজন বেলাগাম কুপিয়ে যাচ্ছে আমায় সেখানে। অতএব উপায়? ব্যাকরণ সিংয়ের মামার অর্ধেকটা কুমীর খেয়ে নেওয়ায় বাকি অর্ধেক দুঃখে মরে গেছিল; আরাবল্লী বা অন্যান্য সমান দুর্দশাপ্রাপ্ত পরিবেশের এ ছাড়া দ্বিতীয় কোনও উপায় নেই মনে হয়। গ্রিনল্যান্ডের ভাগ্যও সেদিকেই এগোচ্ছে। মাটির উপর, নিচ এবং জল – সবই নষ্ট হবে একে একে, যদি আমেরিকা সফল হয় তার কাজে।

কী করলে এই সমস্যার সুরাহা হয়, এই অবাঞ্ছিত আগ্রাসন রোধ করা যায়, কোথায় এর কী কী নিয়ম আছে, এসব আমরা সাধারণেরা অনেকেই জানি না। আমরা শুধু চোখের সামনে দেখি পৃথিবীকে শেষ হয়ে যেতে। আর এ কথা বারবারই মনে হয়, নিয়মনীতি দিয়ে হয়তো বা সাময়িক প্রতিরোধ সম্ভব। কিন্তু সেই উপায়ে অন্যায়ের থেকে ন্যায়ের পথে মানুষকে ফেরানো সম্ভব নয়, মানুষকে বোঝানো সম্ভব নয় ঠিক আর ভুল। সমষ্টিগত ভাবে বিরোধিতা সম্ভব, কিন্তু আমূল বদল একমাত্র সম্ভব ব্যক্তিস্তরে। সে হয়তো অলীক ভাবনামাত্র এখন, তবু তা মিথ্যে নয়। অনেক বছর আগে বলা স্বামীজীর কথা আজও ধ্বনিত হয় মনে মনে, "একসময় গ্রীসের দর্পে পৃথিবী কেঁপেছে। রোমানদের ঈগল-পতাকা বিস্তৃত হয়েছে দেশ দেশান্তরে। আজ গ্রীসের সেই গর্ব একটা ধ্বংসস্তুপ মাত্র। রোমে যেখানে সিজারেরা বসে আধিপত্য বিস্তার করতেন এককালে, আজ সেখানে মাকড়সায় জাল বোনে। পৃথিবীর শরীরে আগ্রাসন বুদ্বুদের মতো ওঠে আর মিলিয়ে যায়। তবু টিকে থাকে পৃথিবী।" এই মানুষটিই আজকের আগ্রাসী আমেরিকার ধর্মমহাসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর শেষ বক্তৃতায় বলেছিলেন, "বিবাদ নয়, সহায়তা; বিনাশ নয়, পরস্পরের ভাবগ্রহণ; মতবিরোধ নয়, সমন্বয় ও শান্তি।" যেখানে যা কিছু হয়ে যাক, পৃথিবী শেষ অবধি এই নিয়মেই চলবে। অ্যানী বেশান্ত তাঁকে সেই মঞ্চে দেখে লিখেছিলেন, "চিকাগোর ঘন আবহাওয়ার মধ্যে জ্বলন্ত ভারতীয় সূর্য ... সন্ন্যাসী – তাঁর পরিচয়? নিশ্চয়ই। কিন্তু সৈনিক সন্ন্যাসী তিনি, প্রথম দর্শনে বরং সন্ন্যাসীর চেয়ে সৈনিকই বেশি মনে হয়।"

এ ছিল এক যথার্থ মূল্যায়ন। বিবেকানন্দ সৈনিক ছিলেন বটে – আগ্রাসী, মৌলবাদী যুদ্ধের নয়; ভালবাসার। ব্যক্তিস্তরে সেই ভালবাসা অনুভূত হলে, তবেই দীর্ঘমেয়াদি বদল কোথাও সম্ভব।

Comments