বৈপরীত্য?

খুব কঠিন কথা। পড়লে, শুনলে বুক কাঁপে। যে মা অনাথের দুর্ভাগ্যে, বিধবা বা বিপত্নীকের কষ্টে নিজে কেঁদেছেন, তিনিই আবার এত সহজে বলছেন – স্বামী, পুত্র, দেহ, সব 'মায়া'? দেহ – যাকে ধারণ করে আমাদের এতকিছু, তাকে এমন অবলীলায় 'দেড় সের ছাই' বলে দিচ্ছেন? গোটা রামকৃষ্ণ ভাবধারাই কি এমন অদ্ভুত বৈপরীত্যে ভরা?

বৈপরীত্য নয়। তাঁরা আমাদের পথ চেয়ে বসে আছেন, পরমার্থের ঝাঁপি খুলে। যে যায়, সে যায়। যা যায়, তা যায়। তাকে আটকে রাখব, মরণশীলকে অমর করব, পার্থিব বৈশিষ্ট্যকে করব শাশ্বত – এমন অলৌকিক বুজরুকি দাবি এ পথে নেই। বাজিকরের সমস্ত বাজিই 'পল দো পল কা শায়র'। একমাত্র বাজিকরই সত্য। আমি, তুমি, এই দেহ, মন, সন্তান, স্বপ্ন, প্রতিষ্ঠা – সব তাঁর বাজি। হাতসাফাইয়ের খেলার মতো আমাদের আসা, আর ততোধিক অতর্কিতেই ফিরে যাওয়া। একমাত্র বাজিকরই সত্য। 'কাল খেল মে, হাম হো না হো, গরদিশ মে তারে রহেঙ্গে সদা'। বাজিকর সেই 'গরদিশ মে তারে'। সে আছে – আকাশে, বাতাসে, শরীরে, মনে, পৃথিবীতে, ব্রহ্মাণ্ডে। সে আছে, ছিল – তাই তো তোমার শরীর মনের এত লীলাচাঞ্চল্য। সে যে ছিল, সে তো তুমিই ছিলে। আছো। থাকবে।

এই পরমার্থ বোঝো। কী বিচিত্র এই খেলা! স্বামী, পুত্র, কন্যা – তাঁরা যখন আছেন, তাঁদের মধ্যে দিয়েই বাজিকর ধরা দেন। তাঁরা যখন চলে যান, বাজিকর অদর্শন হন না। আজ যে জলে রঙিন কাঁচ ধরে তিনি শরবত বানিয়ে কারো তৃষ্ণা মেটাতে ব্যস্ত ছিলেন, কাল সে জলেই তিনি মাছেদের ছেড়ে দেন। তারা খেলা করে। যে বাজি আজ দেহ সেজে খাবার খেয়েছিল, কাল তারই ভস্ম মাটিতে মিশে যায়, তারই হাড় থেকে কত মাটি উর্বর হয়। এই তো খেলা।

ঠাকুর, মা, স্বামীজী, বা তাঁদের মতো আরও যাঁরা ছিলেন দেশ-দেশান্তরে, কাল-কালান্তরে, তাঁরা কাঁদতেন শরীর বা মনের শোকে নয়, অজ্ঞানের শোকে। তাঁরা মনেপ্রাণে চাইতেন, তাঁদের সন্তানেরা অজ্ঞান পেরিয়ে জ্ঞানে পৌঁছক। যেখানে সুখ-দুঃখ, জন্ম-মৃত্যু, এই বাইনারিগুলো নেই। যতক্ষণ তা না হচ্ছে, আমরা পড়ে আছি ধুলোকাদায়, অজ্ঞানে। আমাদের কোলে তুলে নেবেন মা। কাদা মুছে, স্নান করাবেন – জ্ঞানবারিতে। তাই তো পরমার্থের ঝাঁপি খুলে বসে থাকেন তাঁরা, ছেলেমেয়েদের পথ চেয়ে। বৈপরীত্য কই?

Comments