বিবেকানন্দ–সুভাষচন্দ্র যোগসূত্র
নেতাজি সুভাষচন্দ্র বসুর জন্মবার্ষিকীতে কয়েকটি কথা লিখি। আমার পড়াশোনা স্বামী বিবেকানন্দকে নিয়ে। এ কথা নানা জায়গায় আমরা শুনে থাকি যে সুভাষ বসু বিবেকানন্দের আদর্শে ব্যাপকভাবে উদ্বুদ্ধ হয়েছিলেন। তার কিছু ঐতিহাসিক প্রমাণ নীচে কালানুক্রমিক ভাবে লিখলাম। এগুলো মনগড়া, আবেগাপ্লুত কথা নয়। পড়তে গিয়ে যা যা পেয়েছি, তাইই লিখে রাখলাম।
--------
🔶 ১৯১০ সাল। সুভাষচন্দ্রের জীবনে প্রথম প্রেরণা জুগিয়েছিলেন বেণীমাধব দাস – কটকের রাভেনশ' কলেজিয়েট স্কুলের হেডমাস্টার। সেখানে পড়াকালীন সুভাষচন্দ্র মাত্র আড়াই বছরের জন্য পেয়েছিলেন তাঁকে – সুভাষের বয়স তখন বারো থেকে সাড়ে চোদ্দো। বেণীমাধব বাবুর সৌন্দর্য্যবোধ এবং নীতিবোধ তাঁর এই ছাত্রকে মুগ্ধ করেছিল।
🔷 ১৯১২ সাল। পনেরো বছর বয়সে দৈবক্রমে তাঁর দ্বিতীয় গুরুর সঙ্গে সুভাষের সাক্ষাৎ হয়, বইয়ের পাতায়। সুভাষ পরে নানা জায়গায় লিখেছিলেন, ইনিই তাঁর জীবনের আলোকবর্তিকা – স্বামী বিবেকানন্দ। আত্মীয়বন্ধু সুহৃৎচন্দ্র মিত্রের বাড়িতে গিয়ে সুভাষ দেখেছিলেন, বইয়ের তাকে রাখা 'বিবেকানন্দ রচনাবলী'। পরে সুভাষ লিখছেন – "কয়েক পৃষ্ঠা উল্টেছি কি ওল্টাইনি, অবিলম্বে বুঝতে পারলাম – এতে এমন কিছু আছে যা এতদিন আমি খুঁজে মরছি। বইগুলি তাঁর কাছ থেকে চেয়ে এনে গোগ্রাসে গিলতে লাগলাম। মজ্জাবধি শিহরণ খেলে গেল।"
🔶 তাঁর সেই প্রধানশিক্ষক এবং স্বামী বিবেকানন্দের কথা স্মরণ করে সুভাষ লিখেছিলেন, "প্রধান শিক্ষক মহাশয় আমার মধ্যে সৌন্দর্য ও নীতিবোধ জাগ্রত করে আমার জীবনে নতুন প্রেরণা এনে দিয়েছিলেন, কিন্তু এমন কোন আদর্শ তাঁর কাছ থেকে লাভ করিনি, যার জন্য সমগ্র সত্তাকে আমি উৎসর্গ করতে পারি। বিবেকানন্দ তা-ই এনে দিলেন।"
🔷 কিশোর সুভাষচন্দ্রকে সবচেয়ে অনুপ্রাণিত করেছিল বিবেকানন্দের চিঠিপত্র আর কলম্বো থেকে আলমোড়ার পথে দেওয়া বক্তৃতাগুলি। ১৯১৩ সালে, ১৬ বছর বয়সে মেজদাদা শরৎচন্দ্র বসুকে সুভাষচন্দ্র চিঠিতে লেখেন, "আশার দূত আমাদের মধ্যে এসেছেন আমাদের প্রাণের সকল তমঃ নাশ করে হৃদয়ে অনির্বাণ শিখা জ্বালাতে, তিনি ঋষি বিবেকানন্দ।"
🔶 ওই বছরেই প্রবেশিকা পরীক্ষায় পাশ করে সুভাষচন্দ্র ভর্তি হন প্রেসিডেন্সি কলেজে, এবং অল্প দিনের মধ্যেই অন্যান্য ছাত্রছাত্রীদের নিয়ে একটি দল গড়ে তোলেন। নাম দিয়েছিলেন 'Neo-Vivekananda Group'; উদ্দেশ্য ছিল ধর্ম এবং জাতীয়তাবাদের মধ্যে যোগসূত্র খুঁজে বার করা।
🔷 ১৯১৪ সাল। সুভাষচন্দ্রের প্রথম অতর্কিত গৃহত্যাগ। গিয়েছিলেন হিমালয়ে; উদ্দেশ্য ছিল গুরুর সন্ধান ও সন্ন্যাসগ্রহণ। কিন্তু বিভিন্ন আখড়ার অনুদারতা দেখে একেবারে বীতশ্রদ্ধ হয়ে ফিরে আসার পথে সুভাষ যান কাশীর রামকৃষ্ণ মিশন সেবাশ্রমে। দেখা হয় স্বামী ব্রহ্মানন্দের সঙ্গে। মহারাজ সুভাষকে বলেন, ঘরে ফিরে দেশের কাজে উদ্যোগী হতে।
🔶 ১৯১৬ সাল। অধ্যাপক ওটেন বিতর্কে কলেজ থেকে বহিষ্কৃত হন সুভাষচন্দ্র। তখন, কটকে ফিরে গিয়ে প্রায় ৫০-৬০ জন বন্ধুবান্ধব জুটিয়ে আরেকটি দল করেন। সবাই মিলে একসঙ্গে গরীব বসতিতে সেবাকাজ করতেন, এবং কলেরা ও বসন্ত রোগীদের শুশ্রূষা করতেন। এই দলের নাম সুভাষচন্দ্র রাখেন 'নার্সিং ব্রাদারহুড'। স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে সুভাষচন্দ্র লিখেছিলেন, "ধারণাটা সম্ভবত বিবেকানন্দের কাছ থেকে এসেছিল... কারণ, তাঁর মতে, দরিদ্রের বেশেই ঈশ্বর মাঝে-মাঝে আমাদের মধ্যেই আবির্ভূত হন আর দরিদ্রের সেবাই নারায়ণসেবা।" সুভাষের বন্ধু চারুচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায় এক জায়গায় লিখছেন, "সুভাষকে তখন দেখে মনে হতো যেন 'বাডিং বিবেকানন্দ' এবং ভবিষ্যতের আই. এন. এ.-র সূত্রপাত সেখানেই"।
🔷 ১৯২৫ সালে বেঙ্গল অর্ডিন্যান্স অ্যাক্ট অনুসারে একরকম বিনা বিচারেই সুভাষকে গ্রেপ্তার করে ব্রিটিশ পুলিশ। সেই তাঁর প্রথম কারাবাস। জেল থেকে বন্ধু দিলীপকুমার রায়কে চিঠিতে লেখেন, "বিবেকানন্দের প্রতি আমার শ্রদ্ধা প্রগাঢ়।... নানা কারণে আমাদের জাতির কর্মের দিকটা শূন্য হয়ে এসেছে, তাই এখন আমাদের দরকার রজোগুণের 'double dose'।" (৯ই অক্টোবর, ১৯২৫)
🔶 ১৯২৬ সালে বার্মার মান্দালয় জেলে অন্তরীণ অবস্থায় সুভাষচন্দ্র তাঁর কলকাতার এক সতীর্থকে চিঠি লিখে যুবক-যুবতীদের আদর্শের কথা বিস্তারিত লেখেন; সেখানে যেন স্বামী বিবেকানন্দের কথার প্রতিধ্বনি। তিনি যুবকটিকে যেসব বই পড়ার পরামর্শ দেন তার মধ্যে রয়েছে শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণকথামৃত, স্বামি-শিষ্য-সংবাদ, স্বামী বিবেকানন্দের 'পত্রাবলী', 'প্রাচ্য ও পাশ্চাত্য', 'চিকাগো বক্তৃতা' ও 'ভাববার কথা'।
🔷 দেশান্তরে নির্বাসিত হওয়ার পর, ১৯৩৫ সালে সুভাষচন্দ্রের 'Indian Struggle 1920-34' বইটি লন্ডন থেকে প্রকাশিত হয়। তার ভূমিকায় তিনি ভারতবর্ষের তৎকালীন সংগ্রামে শ্রীরামকৃষ্ণ এবং স্বামী বিবেকানন্দের প্রভাবের কথা উল্লেখ করেছিলেন। ওই মুখবন্ধেই স্বামীজীকে তিনি আধুনিক জাতীয়তাবাদী আন্দোলনের 'Spiritual father' হিসাবে অভিহিত করেন।
🔶 এই সময়েই, ভিয়েনায় থাকাকালীন ভাষাচার্য সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের সঙ্গে সাক্ষাৎ হয় সুভাষচন্দ্রের। পরবর্তীকালে সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায় স্মৃতিচারণে জানান, "আমার নিজের মনে হয়েছে, বিবেকানন্দের প্রভাব ছাড়া যে সুভাষচন্দ্রকে ভারতবর্ষ দেখেছে তার আত্মপ্রকাশ সম্ভবই ছিল না।”
🔷 নির্বাসন পর্বের শেষ দিকে, সুভাষচন্দ্র ৬ মার্চ ১৯৩৬ 'উদ্বোধন' পত্রিকার তদানীন্তন সম্পাদক স্বামী সুন্দরানন্দজীকে এক চিঠি লেখেন। এই চিঠির অংশবিশেষ বহুপঠিত, বহুচর্চিত। সেটি আবার তুলে ধরছি এখানে: "শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের কাছে আমি যে কত ঋণী তা ভাষায় কি করে প্রকাশ করব? তাঁদের পুণ্যপ্রভাবে আমার জীবনের প্রথম উন্মেষ। 'নিবেদিতার' মত আমিও মনে করি যে রামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ একটা অখণ্ড ব্যক্তিত্বের (স্বরূপের) দুই রূপ। আজ যদি স্বামীজি জীবিত থাকতেন তিনি নিশ্চয়ই আমার গুরু হতেন – অর্থাৎ তাঁকে নিশ্চয়ই আমি গুরুপদে বরণ করতাম। যা হোক, যত দিন জীবিত থাকব ততদিন 'রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দে'র একান্ত অনুগত ও অনুরক্ত থাকব, এ কথা বলা বাহুল্য।"
🔶 আজাদ হিন্দ সরকারের প্রচারমন্ত্রী এস এ আইয়ার সুভাষচন্দ্র সম্বন্ধে যে স্মৃতিচারণ করেছিলেন, তা দিয়েই শেষ করি। বড় প্রিয় এই অংশটি – "আমি প্রায়শই অবাক হয়ে ভাবতাম হঠাৎ ঘনিয়ে আসা অনিবার্য বিপদ এবং মৃত্যু মুখে নেতাজী যে-সাহসের পরিচয় দিতেন তার গোপন রহস্য কি। আমি এই সিদ্ধান্তে উপনীত হতাম যে, তিনি স্বয়ং ঈশ্বরের কাছ থেকে এই শক্তি লাভ করেন। ... যখন তাঁর মাথায় সর্বাধিনায়কের টুপিখানি রাজকীয় ভঙ্গিতে শোভা পেত, এক বিশেষ কোণে ছুঁয়ে থাকত তাঁর ডান দিকের ভ্রূ-প্রান্ত, তখনও তাঁর প্রশস্ত ললাটে লেখা ফুটে উঠত – তিনি সন্ন্যাসী।"
-----------
মোড়ে মোড়ে আড়ম্বরপূর্ণ পতাকা উত্তোলন, না বুঝে জয় হিন্দ চিৎকার, গলা কাঁপিয়ে বক্তৃতা, ছবিতে ফুলমালার বাইরে এই যোগসূত্রগুলি যদি আমাদের সুভাষচন্দ্রকে জানতে, বিবেকানন্দকে বুঝতে কোনোভাবে সহায়তা করে, তাতেই এই শ্রদ্ধার্ঘ সার্থক হয়েছে বলে আমি মনে করব।
[যে যে গ্রন্থ/লেখাগুলির কাছে আমি ঋণী, সেগুলি হল: ১) চিন্তানায়ক বিবেকানন্দ, ২) তরুণের স্বপ্ন – সুভাষচন্দ্র বসু, ৩) বিবেকদ্যুতিতে উদ্ভাসিত সুভাষচন্দ্র – স্বামী চেতনানন্দ, ৪) স্বামীজীর মানসপুত্র নেতাজি – দেবাঞ্জন সেনগুপ্ত]
Comments
Post a Comment