শ্রীরামকৃষ্ণের কালী
তখন এক একটা দিন যেত, আর দক্ষিণেশ্বরের গঙ্গাতীরে, মাটিতে গড়াগড়ি দিয়ে আছাড়ি পিছাড়ি কাঁদতেন ঠাকুর। গা, হাত, মুখ ছড়ে ছাল উঠে যেত। কিন্তু কান্না থামত না। আশেপাশে লোক জমতো এই 'রঙ্গ' দেখতে – কালীবাড়ির পাগলা বামুনটা আবার ক্ষেপেছে। দ্যাখ দ্যাখ, এ নাকি রাসমণির ভবতারিণীর পুরুত।
চোখের জলে ধুলোমাটি লেগে গাল, মুখ মলিন হয়ে যেত সেই পাগলা পুরুতের। মুখে শুধু ওই এক কথা – "আরেকটা দিন চলে গেল। তুই দেখা দিবি না? একবার দেখা দিতে কী হয় তোর, মা? নাকি তুই সবটাই বানানো গল্প এদের?" মন্দিরে বিধিবিহিত পুজোর সময় পেরিয়ে যায়। ভোগ, অর্চনার সামগ্রী নিজেদের মতো পড়ে থাকে। খ্যাপা গদাধর বসে থাকেন মায়ের বিগ্রহের সামনে ঘন্টার পর ঘন্টা। কখনও মা-কে সাজান, কখনও গান শোনান, কখনও পাথরের মতো মগ্ন হয়ে যান, কখনও বুক চাপড়ে কাঁদেন। শেষটায় বিরহ সহ্য করতে না পেরে কালীঘরের খড়্গ নিয়ে যেদিন নিজেকে শেষ করতে উদ্যত হলেন, আলোয় ভেসে গেল চারদিক। দরজা, জানালা, মন্দির, মূর্তি – কিছুই রইল না। আলোর সমুদ্র। আলোর তরঙ্গ ঝামরে পড়ছে তাঁর উপর চারদিক থেকে। কী গর্জন সেই আলোর, কী তেজ! তিনি নিজেও কি আর মানুষ আছেন? না আলো হয়ে গেছেন? 'মা! মা!' বলে বাহ্যজ্ঞান হারালেন রামকৃষ্ণ।
সেদিন তিনি কালীর মৃন্ময়ী রূপ নয়, চিন্ময়ী রূপ দেখেছিলেন। 'বিশ্বাত্মিকা ধারয়সীতি বিশ্বম্' – বিশ্বের আত্মাকে ধারণ করে আছেন যে শক্তি, তাঁকে দেখেছিলেন ঠাকুর। তিনি কালো নন; তিনি আলোর আলো, জ্যোতির জ্যোতি। তিনি আমার চেয়ে ভিন্ন কোনও মাতৃসত্তা নন, তিনি আমারই অদ্বিতীয় স্বরূপ। তাই তো কথামৃতে কালীর কথা বলতে গিয়ে ঠাকুর বলে ফেলতেন, "যিনিই ব্রহ্ম, তিনিই কালী।" বা "কালীকে দূর থেকে দেখো, তাই কালো লাগে। কাছে যাও, কোনও রঙ নাই। যেমন সাগরের জল – দূর থেকে সবুজ। হাতে তুলে দেখো, রঙ নাই।"
ঠাকুরের ওই "কালীকে দূর থেকে দেখো" কথাটির মধ্যেই বলা আছে, কালীর কোনও একরৈখিক, একস্তরীয় পাঠ অসম্ভব। দূর থেকে দেখতে দেখতে এক-এক করে ধাপ পেরিয়ে কাছে যেতে হয় কালীর। কামনায়-বাসনায় মোড়া মানুষ যখন দূর থেকে তাঁকে দেখে, তখন তাঁকে ভয়ালরূপিনী, অন্ধকারের দেবী বলে বোধ হয়। তিনি চির-রহস্যময়ী মহামায়া। নিজের গর্ভ থেকে তিনি জন্ম দিয়েছেন আমাদের, নিজের স্তন দিয়ে বড় করেছেন। আবার খেলার ছলেই কোনদিন আমাদের সংহার করে গিলে নেবেন নিজ-উদরে। ওই যে তাঁর হাতে খড়্গ! যা কিছুকে আমার বলে আঁকড়ে ধরতে যাব আমি, তার গায়েই অসময়ে নেমে আসবে সেই নির্মোহ খড়্গের আঘাত। আমার সমস্ত কামনা বাসনা শেষে ওই নরমুণ্ডের মতো ঝুলতে থাকবে কালীর হাতে। তাই, প্রথম প্রথম খাঁড়ার ঘায়ের ভয়েই আমরা অনেকে পুজো করি কালীকে।
কিন্তু যা কিছু অপসৃয়মান, তাকে আঁকড়ে রাখার নিষ্ফলা বাসনা থেকে যদি মানুষ মুক্ত হতে পারে, তবেই কালীর ভয়াল আবরণের স্তরটি খসে পড়ে যায়। দেখা দেন স্নেহশীলা মা। সন্তানের পারমার্থিক অগ্রগতির জন্য তিনি উতলা, সদাব্যস্ত। বামদিকের উপরের হাতে যে খড়্গ ধরেছেন তিনি, তা আসলে তাঁর সন্তানের অধ্যাত্মপথের সমস্ত বাধা বিপত্তিকে নির্মমভাবে ছেদন করার জন্য। বামদিকে নিচের হাতে ধরা নরমুণ্ড আসলে জলজ্যান্ত প্রমাণ – যুগ যুগান্তর ধরে এভাবেই তিনি তাঁর সকল সন্তানের পথের আসুরিক বাধাগুলিকে নিধন করে আসছেন। দক্ষিণে উপরের হাতে অভয় মুদ্রা বলে – অভীঃ! নির্ভয়ে এগিয়ে যাও সাধনপথে। নিচের হাতের দান মুদ্রা মায়ের অকৃপণ আশীর্বাদের প্রতীক। সন্তানের চরিত্রের সকল খামতি পুরিয়ে দেবে মায়ের দান। সন্তান না চাইলেও তা পাবে।
তবে প্রথমের ওই মৃত্যুরূপা মাতা এবং দ্বিতীয় স্তরের এই মুক্তিরূপা মাতাকে পেরিয়ে তৃতীয় একটি স্তর আছে – যা কিনা কালীর প্রকৃত স্বরূপ। ভক্তের দৃষ্টি জ্ঞানীর দৃষ্টিতে পরিণত হলে মায়ে আর সন্তানে ভেদ থাকে না কোনও। মা তখন আর কোনও বাহ্যিক রূপ নন, তিনি সন্তানের অন্তরতম প্রকাশ। তখন জীবে জীবে কালীদর্শন হয়। মহামায়ার জগতই স্বয়ং মহামায়া হয়ে ওঠে। বহুরূপে সম্মুখে তোমার। চিন্ময়ী রূপে অবতীর্ণ হয়ে মা দেখা দেন সকলের অভ্যন্তরস্থ শক্তি হয়ে। যে শক্তি আলোর সাগর। তাকেই ঠাকুর দেখেছিলেন।
তবে মায়ের এই অভেদ, ব্রহ্মময়ী সত্তা অনুভব করেও ঠাকুর কেন প্রায়ই ফিরে আসতেন দ্বিতীয় স্তরের সেই মা-ছেলের সম্পর্কে? কারণ, ঠাকুর 'শুকনো জ্ঞানী' হতে চান নি। মায়ের কাছে আব্দার জানিয়েছিলেন – মা যেন তাঁকে রসেবশে রাখেন। তাই ভক্তিরসে, মাতৃবৎসল হয়ে ঠাকুর কেঁদেছেন কালীর কাছে। ঠাকুরের যুক্তি ছিল তাঁর মনের মতোই সরল – রাখঢাক না রেখে ছেলে নিজের মন উজাড় করে দেয় মায়ের কাছে। তাই মায়ের-ছেলের সম্পর্ক ঈশ্বরের কাছে নিয়ে যায় মানুষকে।
অজ্ঞানতার বশে ব্রহ্মের সন্তানেরা ব্রহ্মকে দূরের স্বর্গে ঠেলতে ব্যস্ত দেখে ঠাকুর ব্রহ্মময়ীকে প্রতিষ্ঠা করেছিলেন সন্তানের ঐকান্তিক আর্তিরূপে, মাতৃরূপে। সেই মা কেবল বিগ্রহে, দক্ষিণেশ্বরে, বা ভক্তের মনে অধিষ্ঠিতা নন। 'ব্রহ্ম হতে কীট পরমাণু, সর্বভূতে সেই প্রেমময়।' মন্দিরে আসা বেড়ালের মধ্যে মা-কে দেখে ভোগ খাইয়ে দিচ্ছেন, দাড়িওয়ালা মুসলমানের মধ্যে মা-কে দেখছেন, সমাজের চোখে পতিতা রমণীর মাঝে মা-কে দেখছেন। এমন আক্ষরিক মাতৃপ্রেম দেখে প্রায় উপদ্রুত মথুরবাবু ঠাকুরের কাছে অনুনয় করেছিলেন – 'বাবা, এসব ভাব একটু চেপেচুপে রাখুন এবার।' ঠাকুরকে নিরস্ত করার জন্য বলেছিলেন – 'মা কি আর সব পারেন? এক ডালে কি আর দুই রঙের ফুল হয়? ঈশ্বরকেও প্রকৃতির নিয়মের অধীনেই থাকতে হয়।' ঠাকুর কেবল বলেছিলেন, 'মা চাইলে সব হয়।' পরদিন সকালে দক্ষিণেশ্বরের বাগানের জবাগাছের একই ডালে প্রকৃতি দুটি ফুল ফুটিয়েছিল – একটি লাল, একটি সাদা। ছেলের দেওয়া কথা রাখলেন মা। বিজ্ঞানের ভাষায় জেনেটিক মিউটেশনের এক বিরল, কিন্তু যুক্তিযুক্ত উদাহরণ এটি। আমি বিজ্ঞানের ছাত্র নই; আমার শুধু এটুকু ভেবেই চোখে জল এসে যায় – নিয়ম সবকিছুরই থাকে। কিন্তু ঠাকুরের মতো অমন করে ভালোবাসলে, সেই প্রেমের কাছে সমস্ত নিয়ম ভেঙে ফুল ফোটাতে মা-কে দুবার ভাবতে হয় না।
Suvankar Ghosh Roy Chowdhury
খুব সুন্দর লেখা
ReplyDeleteঅনেক ধন্যবাদ। 🙏
Delete