লক্ষ্মী পুজো
ছোট থেকে শুনে আসি, মা-লক্ষ্মীর পুজো করলে সংসার লক্ষ্মীশ্রী হয়। অর্থাৎ, সংসার লক্ষ্মীশ্রী হওয়ার জন্য যা প্রয়োজন, তা আসে – ধন, এবং তার বিনিময়ে অন্ন ও বস্ত্র। মা লক্ষ্মীর পুজো বিত্তবান হওয়ার পুজো নয়, শ্রীমণ্ডিত হওয়ার পুজো।
ধনের শ্রীবৃদ্ধি হয়, যখন তার সঙ্গে যুক্ত হয় শ্রদ্ধা ও সেবা। কয়েকটা টুকরো টুকরো ঘটনা মনে পড়ে লক্ষ্মীশ্রী বললে। বহু বহু বছর আগে, খুব দুর্ভিক্ষ লেগেছে গ্রামবাংলায়। জয়রামবাটিতে হাহাকার পড়েছে। অবস্থাপন্ন ব্রাহ্মণ রামচন্দ্র মুখোপাধ্যায় তাঁর বাড়ির দরজা খুলে রেখেছেন সকলের জন্য। মরাইবাঁধা ধানে চাল করিয়ে হাঁড়ি হাঁড়ি খিচুড়ি রান্না হচ্ছে সে বাড়িতে। বাড়ির সবাই তাই খাবে, বাইরে থেকে কেউ এলে তাঁকেও ওই খিচুড়িই দেওয়া হবে। কেবল তাঁর আদরের ছোট্ট মেয়ে সারদার জন্য রামচন্দ্র বলে রেখেছেন "ও শুধু ভাল চালের দুটি ভাত খাবে।" খিচুড়ির খবর পেয়ে গ্রামের লোক উপচে পড়ছে রামচন্দ্রের দাওয়ায়। খিচুড়ি কুলাচ্ছে না, আবার চাপানো হচ্ছে। এদিকে অনাহারী মানুষগুলোর পাতে এত গরম খিচুড়ি যে তাঁরা খেতেও পারছেন না। একটি মেয়ে এসেছে, খিদেয় তার চোখ উন্মাদের মতো। অপেক্ষা করার অবস্থা নেই তার। গরুর ডাবায় কুঁড়ো ভেজানো, তাইই তুলে খেতে শুরু করেছে। ছোট্ট সারদা এসব দেখে কী করে? তার যেটুকু কুলোয়, সে তাইই করে। ছুটে ছুটে মানুষের পাতে পাতে যায়, আর আধফোটা পদ্মের মতো ছোট ছোট হাতে প্রাণপণ বাতাস করে। যদি খিচুড়ি তাতে একটু তাড়াতাড়ি জুড়োয়, মানুষ খেতে পারে। শুধু ধনে লক্ষ্মী আসেন না। গ্রামের সকল মানুষের জন্য যার প্রাণ কাঁদে, তিনি যখন দরজা খুলে সকলকে অন্নদান করেন, যখন তাঁর ছোট্ট মেয়ে সাধ্যাতীত সেবা করে সেইসব মানুষের খিদের অপেক্ষা কমানোর চেষ্টা করে, তখন লক্ষ্মী আসেন।
এই ছোট্ট মেয়ে বড় হয়ে আরেকবার এমন কঠিন অবস্থা দেখেছিল। তখন আরও কঠিন। ছোটবেলায় তবু বাবার ধান ছিল; এখন খিদে আছে, উপায় নেই। তাঁর স্বামী দেহরক্ষা করেছেন, তাঁর সান্নিধ্যে আসা বারো জন তরুণ ঘরবাড়ি ছেড়ে তপস্যা করছে। কিন্তু এভাবে কতদিন? খিদের জ্বালা বাড়লে তপস্যা ছেড়ে না বাড়ি ফিরে যেতে হয়। বৈধব্যে আবৃত সেই ছোট মেয়ে – এখন মা, দেখছেন সব। কষ্টে তাঁর প্রাণ হাহাকার করছে। কিন্তু উপায় নেই। তখন সেই মানবী একবার প্রার্থনা করেছিলেন, তাঁর স্বামীর কাছে, মনে মনে। 'তোমার নামে যারা ঘর ছেড়ে বেরোবে, তাদের যেন মোটা ভাত-কাপড়ের অভাব না হয়। তোমার ভাব নিয়ে তারা যেন থাকার সুযোগ পায়, আর সংসারের ত্রিতাপদগ্ধ মানুষ যেন তাদের কাছে এসে তোমার কথা শুনে শান্তি পায়।' এই প্রার্থনায় লক্ষ্মী এসেছিলেন। পৃথিবীর রাশিকৃত ধূপ আর ফুলের চেয়েও একটি আর্ত হৃদয়ের ঐকান্তিক ভক্তি, শ্রদ্ধা তাঁর পায়ে শ্রেষ্ঠতর অর্ঘ্য। আজও সেই সঙ্ঘের কোনও আশ্রমে অবেলায় কোনও অভুক্ত গিয়ে পড়লে, তাঁকে বসিয়ে মোটা চালের ভাত ডাল, আর সামান্য পায়েস খাইয়ে তবে বিদায় জানানো হয়। ফেরার পথে মায়ের পটের দিকে চোখ পড়লে মনে হয়, মা লক্ষ্মী বসে আছেন।
(সারদা মঠে আজ লক্ষ্মীপুজোর ছবি।)
Comments
Post a Comment