দুটি চিঠি
দুটো খুব গুরুত্বপূর্ণ তারিখের মাঝে একটা নীরব, চিঠি-না-আসা দিনে দাঁড়িয়ে আছি। ১৮৯৪ সালের ২৭ আর ২৯ সেপ্টেম্বর চিঠি এসেছিল, মাদ্রাজে আলাসিঙ্গা পেরুমলের কাছে, আমেরিকা থেকে। প্রেরক – বলাই বাহুল্য – স্বামীজী।
দুটো চিঠি আলাদা আলাদা কারণে স্মরণীয় আমার কাছে। কলকাতায় তাঁর বক্তৃতা, কথাবার্তা সম্বন্ধে ছাপা কিছু বইতে তাঁকে 'partisan politics'-এর সঙ্গে জুড়ে দেওয়ার বিরোধিতা করে স্বামীজী লিখছেন – "I am no politician or political agitator. I care only for the Spirit – when that is right, everything will be righted by itself." Spirit, অথাৎ আত্মতত্ত্ব। মানুষের অন্তরতম সত্তার স্বরূপ নির্ণয় ও প্রতিষ্ঠাই স্বামীজীর একমাত্র লক্ষ্য। সেই স্বরূপ জ্ঞাত হলে তা দিয়ে সমাজ-সংস্কার, রাজনীতি, সব সম্ভব – "everything will be righted by itself." কিন্তু আত্মতত্ত্বের গায়ে এসব রাজনৈতিক/সামাজিক লেবেল সেঁটে দিলে, তার ব্যাপ্তিকে অস্বীকার করা হয়। তার সাম্রাজ্য অসীম, তার অভিঘাত অনন্ত।
দ্বিতীয় চিঠিটা স্বামীজীর বহুবদিত শাসন "আমাদের শাস্ত্রে মহা সাম্যবাদ, কার্যে মহা ভেদবুদ্ধি"-র আরেক প্রকাশ। জলের মতো সহজ ভাষায় ভারতীয় হিন্দু সমাজের সমস্যার কথা underline করে দিচ্ছেন রীতিমতো – "The present Hindu society is organised only for spiritual men, and hopelessly crushes out everybody else. Why? Where shall they go who want to enjoy the world a little with its frivolities? Just as our religion takes in all, so should our society." অর্থাৎ, ধর্ম শাস্ত্রে যা বলছে, সমাজ কার্যে তা করছে না। বেদান্তধর্ম বলে ঔদার্যের কথা, অনিঃশেষ গ্রহণের কথা, প্রশ্নাতীত সাম্যের কথা। অথচ সমাজে কেবলই ভেদ, বৈষম্য আর ছুঁৎমার্গ।
একদিকে স্বামীজী যেমন সমাজ ও আদর্শের মধ্যে জন্ম নেওয়া বিরাট ফাটলটা দেখিয়ে দিচ্ছেন আরেকবার, তেমনই অন্যদিকে – এই চিঠিটা স্বামীজীর হৃদয়বত্তার পরিচয়ও বটে। ধর্মপ্রাণ সন্ন্যাসী মানুষ হলেই শুধু হয় না, দরদী হতে হয়। যারা ধর্মপ্রাণ নয়, সন্ন্যাসী নয়, তারা কি কেউই নয় এই সমাজের? তারাই তো বেশি। সমাজ কি ত্যাগ করবে তাদের? উন্নাসিক হয়ে নিজের আধ্যাত্মিক অহংবোধে মুখ ফিরিয়ে থাকবে তাদের থেকে?
গ্রহণ। গ্রহণ করতে হবে সকলকে – বিপথগামীকেও। গ্রহণ করা, স্থান দেওয়া – এসবই মানুষকে পথে আনার প্রথম পদক্ষেপ। বর্জন নয়, হিংসা নয়, যুদ্ধ নয়। ঠাকুর, মা, স্বামীজীর এই একটি কথা – একটিই কথা – গ্রহণ। স্বামীজীর চিঠির পরতে পরতে সেই গ্রহণের কথা, প্রেমের কথা গলে পড়ে সোনার মতো।
Comments
Post a Comment