বিশ্বজনীন ধর্ম

আজ সেই দিন। ১৯শে সেপ্টেম্বর। ধর্ম মহাসভার মঞ্চে আজ স্বামীজীর তৃতীয় বক্তৃতা। ১১ই সেপ্টেম্বরের ধন্যবাদ-জ্ঞাপক, বহু-প্রশংসিত সম্ভাষণটির আড়ালে হারিয়ে যায় ১৯শে সেপ্টেম্বরের 'A Paper on Hinduism'; কিন্তু বক্তব্যের বিষয়বস্তুর নিরিখে আজকের বক্তৃতাটি বিবেকানন্দের স্বরূপ প্রতিষ্ঠা করে। ১১ই সেপ্টেম্বর যদি হয় বিদ্যুচ্চমক, ১৯শে সেপ্টেম্বর গনগনে সূর্য। নামগোত্রহীন এক সন্ন্যাসী, বহির্বিশ্বের কাছে প্রায় invalid হয়ে যাওয়া একটি 'বর্বরোচিত' ধর্মের সন্ন্যাসী ধর্মমহাসভার মঞ্চে দাঁড়িয়ে তাঁর দেশের গর্বে, দেশজ আধ্যাত্মিকতার গর্বে জাজ্বল্যমান। বলছেন – পৃথিবীর প্রাচীনতম তিনটি ধর্মের মধ্যে জুডাইজম খ্রিষ্টধর্মের ভাবকে গ্রহণ না করতে পেরে প্রাসঙ্গিকতা হারিয়েছে; জোরাস্ট্রিয়ানিজম অস্তিত্ব সংকটের মুখে দাঁড়িয়ে। এক এই বেদান্ত স্থান দিয়ে চলেছে নিরাকার অদ্বৈত ভাবনা থেকে শুরু করে সাকার দ্বৈত উপাসনাকে, উপনিষদ থেকে পুরাণকে, বৌদ্ধদের অজ্ঞেয়বাদ থেকে জৈনদের নিরীশ্বরবাদকে। কিচ্ছুতে তার না নেই। এত বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্য কোথায়, ঝর্ণার মতো ইংরাজিতে বুঝিয়ে চলেছেন সন্ন্যাসী।

এই বক্তৃতায় স্বামীজী প্রথম ব্যবহার করলেন একটি নতুন শব্দ – "Universal Religion" বা 'বিশ্বজনীন ধর্ম'। শুধু ব্যবহারই করলেন না, একেবারে সংজ্ঞা দিলেন। তিনি যে সময়ে বিশ্বমঞ্চে উঠে দাঁড়াচ্ছেন, প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যে কিন্তু চিন্তকের অভাব নেই। অথচ বেদান্তধর্ম তথা অন্যান্য ধর্মের উদার পন্থাগুলি নিয়ে, এবং বিজাতীয় পন্থাগুলি বর্জন করে, আত্মোন্নতির জন্য বিশ্বজনীন কোনও পথের সন্ধান কেউ দিতে পারেন নি তখনও। বিবেকানন্দ দিলেন, সাড়ে তিরিশ বছর বয়সে।

সেই ধর্মের সংজ্ঞা –

if there is ever to be a universal religion, it must be one –

১) which will have no location in place or time: দেশ ও কালের ঊর্ধ্বে যেতে হবে সেই ধর্মকে, বদ্ধ হলে চলবে না।

২) which will be infinite like the God it will preach: যে উদার ঈশ্বরের কথা পৃথিবীর সব ধর্ম এতদিন বলে এসেছে অথচ তাঁকে প্রতিষ্ঠা করতে গিয়ে নিজেরা গোঁড়া হয়ে পড়েছে, সেই ঈশ্বরেরই মতো উদার হতে হবে বিশ্বজনীন ধর্মকে।

৩) and whose sun will shine upon the followers of Krishna and of Christ, on saints and sinners alike: সেই ধর্মের ঔজ্জ্বল্য, বিভা পৃথিবীর কাউকে বঞ্চিত করবে না তার কৃপা থেকে। কৃষ্ণ বলি আর খ্রিষ্ট, সবার জয়গান গাইবে সেই ধর্ম। এমনকি পাপী যদি অনুতাপে চোখের জল ফেলে সৎপথে আসতে চায়, তাকে তখন ত্যাগ করার মতো নিষ্ঠুর হবে না সেই ধর্ম।

৪) which will not be Brahminic or Buddhistic, Christian or Mohammedan, but the sum total of all these, and still have infinite space for development: প্রচলিত সব ধর্মগুলি নিজেদের সীমানা ঠিক করতেই ব্যস্ত; তাদের কৌলীন্য রক্ষা করতে গিয়ে তারা এঁদো পুকুরে পরিণত হয়েছে। বিশ্বজনীন ধর্ম এই সমস্ত ধর্মের উদারতাকে গ্রহণ করে আরও, আরও বিস্তার করবে নিজেকে। অসীম ঔদার্যের দিকে সে ছুটবে ধূমকেতুর মতো।

৫) which in its catholicity will embrace in its infinite arms, and find a place for, every human being, from the lowest grovelling savage not far removed from the brute, to the highest man towering by the virtues of his head and heart almost above humanity, making society stand in awe of him and doubt his human nature: জীবনযুদ্ধে পরাভূত, কীটানুকীট সাধারণ মানুষ থেকে শুরু করে অসমসাহসী দেবমানব – সকলকে, প্রত্যেককে উদার আলিঙ্গনে আবদ্ধ করবে এই ধর্ম।

৬) It will be a religion which will have no place for persecution or intolerance in its polity: ধর্মের নামে অসহিষ্ণুতা আর নিপীড়নকে ঠাঁই দেবে না এই বিশ্বজনীন ধর্ম, 

৭) which will recognise divinity in every man and woman: সকল মানব-মানবীর অভ্যন্তরস্থ বীজরূপ দেবত্বকে সাদর অভিবাদন জানাবে এই ধর্ম, এবং –

৮) and whose whole scope, whose whole force, will be created in aiding humanity to realise its own true, divine nature: তার পূর্ণ শক্তি প্রয়োগ করে তার একমাত্র জীবনোদ্দেশ্য হবে – মানুষকে নিজ দেবত্বের সন্ধান দেওয়া, সেই পথে তাঁকে চালিত করা, এবং সবশেষে সেই দেবত্বে মানুষকে প্রতিষ্ঠিত করা।

ধর্মাচরণ, ঈশ্বরবিশ্বাস মানুষের স্বাভাবিক প্রবৃত্তি। তাই, ধর্মকে নির্মূল করে নয়, সুগঠিত ভাবে ব্যবহার করেই এগোবে মানুষের জীবনগতি – এইই বিশ্বাস ছিল স্বামীজীর। একটি সুগঠিত ধর্ম কেমন হতে পারে – তার ব্লু-প্রিন্ট স্বামীজী দিয়ে দিয়েছিলেন সেইদিনই। সম্প্রদায় নয়, একজন ব্যক্তিমানুষ হিসেবেও যদি আমরা আজীবন চেষ্টা করি উপরের সংজ্ঞার কোনও একটি অংশও নিজজীবনে পালন করার, বিশ্বজনীন মানবধর্মের জয় হবে সেখানেই।

সবকিছু আমাদের হাতের কাছেই আছে। স্বামীজী বলে গেছেন বহুদিন আগে। আজকের দিনটি উপলক্ষ্যে আবারও বলার – স্বামীজীকে ফার্স্ট হ্যান্ড পড়ুন। তাঁর অক্ষরশরীর আজও আমাদের সঙ্গে কথা বলে। আগামীদিনেও বলবে।

Comments