দুই বন্ধুর আলাপচারিতা

আচ্ছা, ঠাকুর যে কথাগুলো ভক্তদের বলতেন, অমন দার্শনিক কথাগুলো উনি বলতেন কি করে? উনি তো কোনও প্রথাগত শিক্ষায় শিক্ষিত নন তবু ওইসব কালজয়ী কথা যেগুলো বাণীরূপে প্রচার হয় সেগুলো কি আপনাআপনিই বেরিয়ে আসতো ওনার মুখ দিয়ে? মানে অতো সাংঘাতিক দর্শন, শুধুই কি অভিজ্ঞতা না কি এটাই অবতার হয়ে জন্মানোর বৈশিষ্ট্য?  মানে তোমায় কি ঠিক করে বোঝাতে পারছি আমার জিজ্ঞাসার জায়গাটা?

এই যে প্রায় অবিশ্বাস্য একটা ব্যাপার, এ থেকেই বোঝা যায়, তত্ত্বের আগে উপলব্ধি আসে। ঠাকুর যে সব কথা বলতেন, সেগুলো বেদান্তের বা সমগোত্রীয় শাস্ত্রের কথা। অথচ তিনি নামমাত্র লিখতে পড়তে জানতেন, পাঠশালার শিক্ষা অব্দি শেষ করেন নি। হতে পারে তিনি পরবর্তী জীবনে বড় বড় পণ্ডিতদের কাছে বেদান্তশাস্ত্র নিয়ে নানা কথা শুনেছেন। কিন্তু ঠাকুরের কথাগুলো তো ঠিক শাস্ত্রের আলোচনা নয়, এক একটা revelation-এর মতো। ঠাকুর যেন একটা স্ফটিক, আলো রূপী ঈশ্বর তাতে পড়ে ঠিকরে বেরোচ্ছেন।

এ থেকে বোঝা যায়, বেদান্তে আমরা যা পাই, সেগুলো তত্ত্বের চেয়েও বেশি উপলব্ধ সত্য। সেটা যে কেউ উপলব্ধি করতে পারে, যদি তাঁর সেই সচেতনতা, উচ্চ মনের অবস্থা থাকে। তত্ত্ব থেকে কোনোদিন সত্য সৃষ্ট হয় না। সত্যের উপলব্ধি হয়, এবং পরে তা তত্ত্ব আকারে লিখিত হয়। 

ঠাকুর যা বলতেন, তা উপলব্ধি, এবং তা বেদান্তের সঙ্গে প্রায় অক্ষরে অক্ষরে মিলে যেত।

এই কথাটা বড়ো ভালো লাগলো, "তত্ব থেকে কোনদিন সত্য সৃষ্ট হয় না। সত্যের উপলব্ধি হয়, এবং পরে তা তত্ব আকারে লিখিত হয়।"

হ্যাঁ গো। আমার তো তাইই মনে হয়। ঈশ্বরকে জানার জন্য, ভালোবাসার জন্য যদি পাণ্ডিত্যের প্রয়োজন হয়, তবে তো সে ঈশ্বরের partiality হয়ে গেল। পাণ্ডিত্য কজনের কাছে আর পৌঁছয়। বেদান্ত শাস্ত্র কজনের আর পড়া হয়ে ওঠে। 

ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার জন্য ভালো মন চাই। সৎ মন চাই। আর খুব ইচ্ছে চাই। দেখবে, ঠাকুর বলছেন – সত্যের আঁট চাই, আর ব্যাকুলতা।
হ্যাঁ, ঠাকুরের সরল, সহজ কথার জন্যই কাছে যাওয়ার আত্মবিশ্বাস পাওয়া যায়। মনে  দ্বিধা থাকে না কোনও!!

আমাদের প্রত্যেকের কাছে সেই সৎ মন আছে। By default. ধরে নাও, এক টুকরো লোহা।
কিন্ত এও সত্যি যে আমাদের সেই মনের উপর অনেক জঞ্জাল, ময়লার আস্তরণ পড়েছে। অসততা, লোভ, কামনা, বাসনা, হিংসা, ঘৃণা, রাগ, অহংকার – সব হলো এক একটা আস্তরণ। এই সব মিলেমিশে এমন এক অবস্থা করেছে যে এখন আমি আর চিনতেই পারি না ওই লোহার টুকরোটাকে লোহা বলে। আছে, অথচ মনে করছি নেই।
 
এই জঞ্জালের আস্তরণগুলো রোজ একটু একটু করে ঘষে, মেজে তোলার জন্যই কথামৃত পড়া, গীতা পড়া, মায়ের বা স্বামীজীর কথা পড়া। বা আরও যে কোনও আধ্যাত্মিক কথা পড়া, বা আলোচনা করা। এই বইগুলো বা আমাদের এই আলোচনা আমাকে ঈশ্বর উপলব্ধি করিয়ে দেবে না। কিন্তু ঈশ্বরকে ভাবার জন্য যে মনটা দরকার, সেটা পেতে একটু একটু করে সাহায্য করবে।

চোখের সামনে সারাক্ষণ এইরকম  এক টুকরো লোহা থাকলে আমিও বুঝতে পারব যে আমার মনটাকে আরও কতটা ঘষামাজা করতে হবে, বা ভুলে গেলে মনে পড়ে যাবে ঘষামাজার কথা। এটুকুই প্রয়োজন।

যত ময়লা মুছবে, তত লোহার নিজস্ব যে গুণ, তা প্রকাশ পাবে। আর যত লোহার নিজস্ব গুণ প্রকাশ পাবে, তত ঈশ্বর চুম্বকের মতো সেই মনকে টানবেন নিজের দিকে।

এই কারণে, কোনও বড় সাধু মানুষের কথা শুনবে যখন, দেখবে অনেকে তাঁকে প্রশ্ন করে – ঈশ্বরকে অনুভব করতে গেলে কী কী চাই?

তিনি কোনোদিন বলেন না যে বাইরে থেকে কিছু চাই। বাইরের জগতের একটা জিনিসেরও প্রয়োজন নেই ঈশ্বরকে জানতে গেলে। যা আছে, অলরেডি তোমার কাছেই আছে। তোমার মন। আয়না আছে, আয়নায় ধুলোর আস্তরণ। মুছে নিলেই মুখটা দেখা যায়। অথচ আমরা না মুছে আরও আরও আয়নার খোঁজ করছি। 
স্বামীজী বলতেন, আমাদের অবস্থা এত শোচনীয় যে নদীর তীরে বসে আমরা এক গ্লাস জলের জন্য হাহাকার করছি। এটুকু বুঝছি না যে পাশেই নদী বয়ে চলেছে। 
প্রতি ক্ষেত্রেই দ্যাখো, তোমার থেকে খুব কিছু demand করা হচ্ছে না। ছোটাছুটি, দৌড়াদৌড়ি, কিচ্ছু না। শুধু শান্তভাবে একাগ্রভাবে নিজের মনকে পর্যবেক্ষণ করো, এবং সার বস্তু থেকে অসার বস্তুকে আলাদা করার চেষ্টা করো। এইই হলো ধ্যান।

জীবনের বেশিটা সময় ধরেই আমাদের ছোটাছুটিটা X axis বরাবর। অগভীর। খালি এই বাড়ি থেকে ওই বাড়ি, এই মানুষ থেকে ওই মানুষ, এই চাকরি থেকে ওই চাকরি, এই দোকান থেকে ওই দোকান, এই খাবার থেকে ওই খাবার, এই দেবতা থেকে ওই দেবতা। কোথায় একটু বেশি সুবিধে, একটু বেশি comfort পাওয়া যায়, এর সন্ধান।

আর আধ্যাত্মিকতা আমাদের শুধু ছোট্ট একটা কাজ করতে বলে। একটা কিছুকে ধরো – ধরে Y axis বরাবর নামতে থাকো গভীরে। অনর্থক সঞ্চয়ের ভার না বাড়িয়ে, বিশ্লেষণ করো। একটা মানুষকে আরও কত ভাবে চেনা যায়, চেনো। হতেই পারে না যে আমার তাকে সব ভাবে চেনা হয়ে গেছে। চিনতে চিনতে এমন সব দিক বেরোবে, যে মনে হবে এতদিন এগুলো দেখিনি কেন। এবং কম ছোটাছুটি করে, যত গভীরে যাবে, দেখবে সব কিছুই এক দিকেই নিয়ে যাচ্ছে তোমায়। এবার তাকে তুমি আত্মা বলো, ঈশ্বর বলো, আমি বলো – যেমন খুশি।

ঠাকুর বলতেন, যে চাষা আজ এখানে, কাল সেখানে, পরশু ওখানে একটু একটু করে মাটি খুঁড়ে জলের সন্ধান করে, কোথাওই সে জল পায় না। শুধু খুঁজেই মরে। আর যে চাষা ধৈর্য্য ধরে এক জায়গাতেই খুঁড়ে যায়, তার সময় লাগলেও একদিন না একদিন জল ঠিক উঠে আসে।

শেষ প্যারা টাই মূল লেখাটার সারাংশ। তুমি এগুলো সব পড়াশুনো করেই জেনেছো না কি শুনে শুনেও..??

পড়েছি, শুনেছি, এবং ভেবেছি। এই শেষ কাজটা আমার কাছে খুব গুরুত্বপূর্ণ। পড়া বা শোনায় মূল কর্তা আরেকজন। আমি শুধু passive শ্রোতা বা পাঠক মাত্র। শুনে ভালো লাগলো বা লাগলো না। পড়েও তাই।

কিন্তু ভাবায় আমি কর্তা। ভাবতে গেলেই মন engaged হয়, এবং ভাবতে ভাবতে এমন হয় যে অন্য কাজ করে চলেছি যন্ত্রের মতো। মাথায় এই ভাবনা চলছে। ভাবা কাজটা আমার কাছে একদম essential। যত ভাববে এইগুলো নিয়ে, তত তোমার মন সেদিকে চালিত হবে।

জানো তো, শাস্ত্রমতে বলে, ঈশ্বরকে উপলব্ধি করার চারটে পথ আছে। যথা – জ্ঞান যোগ, ধ্যান/রাজ যোগ, কর্ম যোগ, ভক্তি যোগ।

এর মধ্যে জ্ঞান এবং রাজ যোগ আমাদের মতো সাধারণ, সংসারী মানুষদের জন্য খুব একটা প্রযোজ্য হয় না। একেবারে পূর্ণ মনোযোগ সহকারে শাস্ত্র অধ্যয়ন করা আমাদের হয়ে ওঠে না। বা দিনের পর দিন নির্জনে থেকে ধ্যান, যোগাসন, প্রাণায়াম (রাজ যোগ) আমাদের হয়ে ওঠে না।

কর্মযোগ আমাদের কিছুটা কাছের। কর্মযোগের মূল কথা – কর্ম করো, কর্তৃত্ববোধ রেখো না। মনে করো, সবই তাঁর কাজ। তুমি কেবল বকলমে কাজ করছো। 
কিন্তু এই ভাবটাও টানা নিজের মনে ধরে রাখা খুব কঠিন। এর জন্য নিজের 'আমি'কে পুরো মেরে ফেলতে হয়। নাহলেই 'আমি' এই কাজ করছি, কাজটা ভালো হলে 'আমার' ভালো হবে, খারাপ হলে 'আমার' বদনাম হবে – এইসব চিন্তা এসে পড়ে। আর আমরা যেহেতু অনেক ক্ষেত্রেই মনের দাস, সে জন্য 'আমি'কে পুরোপুরি সরিয়ে রাখা যায় না। আমি যে কিছু করছি, এটা ভাবতে ভালো লাগে আমাদের।

সবচেয়ে সহজ হলো ভক্তিযোগ। ঈশ্বরকে ভালোবেসে, তাঁর আনন্দের জন্য কাজ করা। আমাদের সংসারী মানুষদের প্রায় সময়ই কারো না কারো আনন্দের জন্য কাজ করতে হয় – বাবা-মায়ের, ছেলে-মেয়ের, স্বামী-স্ত্রীর। সত্যিই যাকে ভালোবাসি, তাঁকে আনন্দ দেওয়ার জন্য কাজ করা কেমন, সে আমরা খুব ভালো করে জানি। সেই ভালোবাসার পাত্র যদি ঈশ্বর হন, তবে আমাদের সমস্ত কাজ তাঁর আনন্দের জন্য করা হবে। এবং ঠিক যেমন আমার প্রিয় কারো জন্য আমি খারাপ কিছু আনবো না, তেমনই ঈশ্বরকে ভালোবাসলে, এই জীবন তাঁর উদ্দেশ্যে উৎসর্গ করলে, জীবনে আমরা খারাপ কাজ, খারাপ চিন্তাও করতে পারবো না। জীবন ভালোর দিকেই প্রবাহিত হবে।

এখন কথা হলো, ঈশ্বরকে ভালোবাসবো কী করে? যাকে ভালোবাসবো, তাঁর একটা রূপ চাই, এবং তাঁর কিছুটা আমার জগতের বাসিন্দা হওয়া চাই। নিরাকার, বা ধরাচুড়ো পরা দেবতাদের প্রতি আমার তো বড় একটা ভালোবাসা আসে না কোনোদিনই। 

এইখানেই ঠাকুর। মা। 
তাঁরা একেবারে আমাদের জগতের মানুষ, গ্রামবাংলার দরিদ্র ঘরের মানুষ। অন্যদিকে তাঁরা এমন এক এক মানুষ, যাঁরা ঈশ্বরকে উপলব্ধি করে স্বয়ং ঈশ্বরেরই প্রতিভূ হয়ে উঠেছেন। তাঁদের আমরা ঈশ্বর ভাবতে পারি, মানুষও ভাবতে পারি। তাঁদের ভালোবাসলে, তাঁদের মধ্যে দিয়ে ঈশ্বরকেই ভালোবাসা হয়।

এই ভালোবাসা যদি একবার পাকা হয়ে যায়, আর ভাবনা নেই।

ভিত তো মনে মনে আমি কেটেই ফেলেছি। ঠাকুরের আশীর্বাদ হলে ঘরটাও পাকা হয়ে যাবে একদিন।

Comments