সময় না হলে হয় না

বাবার হাতের লেখা। 

"শুভঙ্করকে
বাবা-মা।
২৪/১/১৪"

এর সঙ্গে এরকমই ছোট ছোট আরও চারটে বই – কোনোটায় স্বামীজীর কথা, কোনোটায় মায়ের। সব মিলিয়ে পাঁচটা বই একসঙ্গে পাওয়া গেল গত পরশু, ঘর গোছানোর সময়, কোনও এক বইয়ের তাকের পিছনে একেবারে একজোটে। এদের স্পর্শও করা হয়নি, মলাট উলটে দেখা হয়নি। যেমনভাবে এনে দেওয়া হয়েছিল শুভংকরকে, ঠিক সেভাবেই রাখা। 

এবার মনে করতে বসি, ২০১৪ সাল। মানে মাস্টার্স পেরিয়ে নরেন্দ্রপুরে তখন বছর দুই পড়ানো হয়ে গেছে। আর এক বছরের মধ্যে নরেন্দ্রপুরের চাকরি ছেড়ে অন্য চাকরিতে চলে যাবো। সেই সময়ে, ২০১৪ সালের জানুয়ারি মাসে বাবা-মা এই উপহার এনেছিলেন আমার জন্য।

আর আমি কী করেছিলাম? বইগুলো দেখতে দেখতে স্পষ্ট মনে পড়ে। হাত পেতে গ্রহণ করেছিলাম, কিন্তু মনে মনে বলেছিলাম, "উফ, আবার এই রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দের কথা! আবার জ্ঞানের বাণী! সপ্তাহে পাঁচদিন মিশনে যাই, পড়াই; তাতেও শান্তি নেই? আবার এখন এসব বই পড়েও মানুষ হতে হবে?"

অতঃপর, বইগুলোকে হয়তো বা একবার নেড়েচেড়ে, বা সেটুকুও না দেখে ঠেলে দিয়েছিলাম বইয়ের তাকের একদম পিছনে – যাতে কারো চোখে না পড়ে তারা। আউট অফ সাইট, আউট অফ মাইন্ড। চোখে না পড়লে বাবার জিজ্ঞেস করতেও মনে থাকবে না, আমি পড়েছি কিনা। 

তখন, রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবাদর্শ, ভারতীয় দর্শন, বেদান্তের কথা – আমার কাছে যথেষ্ট 'ফ্যাশনেবল্' নয়। ইউরোপীয় মডার্নিজমের সামনে, সার্ত্র-বেকেট-কামুর সামনে আলাভোলা, নিরক্ষর, কামারপুকুরের পাগলা বামুন বিশেষ ঠাঁই পান না। তাঁর শিষ্য সম্বন্ধেও আমার উৎসাহ ওই "ওঠো জাগো"-তেই শেষ। আমি তখন 'মিশনের কলেজে পড়াই' বলার দেমাকটুকু চেটেপুটে খাই, কিন্তু রামকৃষ্ণ ভাব-আন্দোলন নিয়ে কিছু দেখলেই শতহস্ত দূরে পালাই।

এই অবস্থায় বইগুলো সেই বইয়ের তাকের পিছনে পড়ে থাকে সাড়ে এগারো বছর। চোখের আড়ালে। ঢেউ ওঠে, ঢেউ পড়ে। যে আমি 'রামকৃষ্ণ' নাম শুনলে উলটো দিকে হাঁটতাম, সেই আমি তাঁকে 'ঠাকুর, তুমি' বলে ডাকতে শিখেছি। যে আমি বিবেকানন্দের কথা শুনতে হলে ভাবতাম কখন শেষ হবে, সেই আমি 'Lectures from Colombo to Almora' পড়ে কাঁদতে শিখেছি। যে আমার কাছে সারদামণি দেবী ছিলেন লজ্জাবনতা, অবগুণ্ঠিতা এক প্রৌঢ়া, সেই আমার কাছে সূর্যের চেয়েও জ্যোতির্ময় মা হয়ে উঠেছেন এতদিনে। এখন, তাঁদের চোখে হারাই।

এসব সময়েই, এই সব বই হাতে পড়ে গেলে মনে হয় – cosmic connection! বাবা-মা যে সময়ে এই বইগুলো পড়ানোর আশা নিয়ে শুভঙ্করকে দিয়েছিলেন, সেই সময়ে যতটা হৃদয়হীন আচরণ করা সম্ভব এই বইগুলোর সঙ্গে, শুভংকর তাইই করেছে। সেই বইয়ের অক্ষরের মধ্যেকার ঘনীভূত মানুষেরা কেবল অপেক্ষা করেছেন সঠিক সময়ের। শিকারের ভাষায় যেমন বলে Pounce করা, তাঁরা ঠিক সেভাবেই আমার উপর ঝাঁপিয়ে পড়েছেন তারপর। তার জন্য বইয়ের তাকে বইগুলোর একটা পাতাও এদিক ওদিক হয়নি।

স্বামীজী বলতেন, "Deluge the land with spirituality first." আমার ভিতরের ঘরবাড়ি সেরকমভাবেই শেষ কিছু বছরে একেবারে ভেসে গেছে এঁদের ভাবনায়। এতদিনে বইগুলো বেরিয়ে পড়লো। সময় হয়েছে তাদের পড়ে দেখার। হাতে নিয়ে মনে হলো ঠাকুরেরই কথা, সময় না হলে হয় না। 

এতদিন সময় হয়নি। তাই তারাও অপেক্ষা করছিল, আমিও ছিলাম। এবার সময় হলো। যেখানে আসার কথাই ছিল, সেখানেই এসে পড়লাম।


Comments