কে আর তেমন ভালোবাসে...

প্রশ্নাতীত গ্রহণ কি দুর্বলতার লক্ষণ? কে জানে। আমার তো তেমন মনে হয় না। গ্রহণ করা তো আপোস করা নয় সবসময়; সে তো আশ্রয়দান, ভালোবাসাও বটে। কিন্তু আজকের আস্ফালনের যুগে, পেশিশক্তির যুগে গ্রহণ যেন দুয়োরানি। স্বার্থহীন ভালোবাসা, যেন নিজেকে অশক্ত প্রমাণ করা। মতভেদ সত্ত্বেও প্রেমপূর্ণ সহাবস্থান, ভিন্নতা নিয়েও বেঁধে বেঁধে থাকা যেন সোনার পাথরবাটি। একটা শুঁয়োপোকা কোনোভাবে জামায় এসে পড়েছে, তাতেই সে একটু একটু করে হাঁটার চেষ্টা করছে। আমি তাকে ঝেড়ে মাটিতে ফেলে পা দিয়ে পিষে দিলাম। এই শেষটুকু না করলেও চলতো। তবু করলাম, কারণ আমার বোকাবুদ্ধিতে ওই শুঁয়োপোকার থাকা বা না-থাকার উপর আমার স্বার্থ নির্ভর করে না। তাই, সে পরিহার্য। তার বাঁচাও যা, মরাও তাই। আমার জামায় ওঠার শাস্তিস্বরূপ আমি যে তাকে পিষে দিলাম, এমন নয়। পিষলাম, কারণ সে আমার পায়ের কাছেই গিয়ে পড়েছিল। অবশ্য মানুষকেই আমরা পিষে দিই কতবার। স্বপ্রজাতির প্রতিই ভাব নেই, তার আবার শুঁয়োপোকা।

এসব সময় আমার মায়ের কথা মনে পড়ে। সারদা মা। জাগতিক পরিচয়ে – উনিশ শতকের গ্রামবাংলার নিরক্ষর এক মানবী তিনি। কিন্তু সে সব কেবল প্রেক্ষিত মাত্র। তার অতীতে মা হয়ে উঠেছিলেন গ্রহণ ও স্বার্থহীন ভালোবাসার মূর্ত প্রতীক।

মায়ের ভালোবাসা কেবলমাত্র মানবের পরিধিতে সীমাবদ্ধ ছিল না। পরিচিত, পুরোনো ঘটনাই মনে পড়ে – বেলুড় মঠে স্বামী বিবেকানন্দের ইচ্ছায় একবারই ছাগবলি দেওয়া হয়। ওই একবারই। বলির খবর মায়ের কাছে পৌঁছনোয় মা শাস্ত্রমতে ঔচিত্য বিচারে বসেন নি। শুধু বলেছিলেন, ঠাকুরের ভাবে যে মঠ প্রতিষ্ঠিত হয়েছে, সেখানে এমন কোনও কাজ অনুষ্ঠিত না হয় যেন, যা কোনও জীবের ভীতির কারণ হয়ে উঠতে পারে। এই মঠে যা অনুষ্ঠিত হবে, তা কেবল মানুষের নয়, সর্বজীবের কল্যাণার্থে। সেই থেকে আজ অবধি মঠে বলি হয় না আর।
এছাড়াও তো কত ঘটনা আছে। একদিকে শরৎ মহারাজ, অন্যদিকে দস্যু আমজাদ – উভয়েই মায়ের সন্তান। এর মানে কি এইই যে মা দুর্বৃত্তের স্বভাবকে প্রশ্রয় দিতেন? না। আজকের অগভীর যুগে আমরা গ্রহণ আর আপোসে গুলিয়ে ফেলি, মনে করি – ভালোবাসলে, শাসন অসম্ভব। দুর্বিনীত স্বভাব, অশ্রদ্ধা, স্খলন – কিছুকেই প্রশ্রয় দেন নি মা। কিন্তু সাধারণে যেখানে এদের ঘৃণাসূচক দৃষ্টিতে দেখে, মা সেখানে দেখেছেন ক্ষমাশীল চোখে। দুর্বৃত্ত জীবনের কোন আঘাতে এই পথ বেছে নিয়েছে, কোন ইতিহাস একজন মানুষকে খর করে তুলেছে – মায়ের চোখে সেগুলি পড়তো। তাই, মা তাদের ছন্নছাড়া না করে আশ্রয় দিয়েছিলেন। এমন গ্রহণ অনেকসময়ই মানুষের মতি ফিরিয়ে দেয়। কারণ, এতকিছু অগ্রগতির পরেও, আমরা আজও ভালোবাসারই কাঙাল।

ঘরোয়া জীবনে এমন ছোট ছোট আদরের, গ্রহণের, আশ্রয়ের উদাহরণগুলি মা আমাদের জন্য রেখে গেছেন – যাতে আমরা অনুসরণ করতে পারি। আজকের জগতের আস্ফালনধর্মী, পেশিবহুল দিকটি এমন ভালোবাসা, গ্রহণকে স্বীকার করে না বটে; কিন্তু নীরবে, নিভৃতে এমন মনের কর্ষণ কিন্তু হয়ে চলেছে। একটু শান্তভাবে দেখতে চেষ্টা করলেই, দেখতে পাওয়া যাবে। আমি আমার জীবনে দেখে চলেছি। যে-সব মানুষের সঙ্গে আমার দিনযাপন, তাঁদের মধ্যকার এই মাতৃভাব, গ্রহণ ও ক্ষমার ভাব আমাকে মুগ্ধ করে। প্রেমের যে আদর্শ বুনতে মা এসেছিলেন, তার কথা আমার মনে পড়ে। মানুষের বেঁচে থাকা, ভালো থাকা তো এই আদর্শেই। ইচ্ছেমতো কাউকে পিষে দেওয়ায় নয়।

প্রেমময় এই মাতৃভাব আমি যে যে মানুষের থেকে পাই, স্ত্রী-পুরুষ নির্বিশেষে তাঁদের সবাইকে আজকের দিনের শুভেচ্ছা ও শ্রদ্ধা জানাই। নারী দিবস দাঁতে দাঁত চাপা লড়াইয়ের উদযাপন হোক, অসীম সব স্বপ্নের সুস্পষ্ট উচ্চারণ হোক, কিন্তু তার চেয়েও বেশি সে আমার কাছে হোক অপ্রতিরোধ্য এক ভালোবাসার, গ্রহণের ইতিহাস। সত্যিকারের ভালোবাসায়, গ্রহণে যুদ্ধ বা স্বপ্নের স্বার্থ ক্ষুণ্ণ হয় না বলেই তো মনে হয়।

Comments