ওঁরা তিনজন

আট মিনিট কুড়ি সেকেন্ড আগে সূর্য নিভে গেছে। তার শেষ রশ্মিটি এতটা পথ পেরিয়ে এইমাত্র তোমার কাছে এসে পৌঁছল। ব্যাস, এবার সব শেষ। বায়ুমন্ডলের ধুলোবালিতে শেষ আলোর বিচ্ছুরণটুকুও এইমাত্র মিলিয়ে গেল। আমাদের প্রতিবেশী গ্রহগুলোর শরীর থেকে চুঁইয়ে পড়া আলো আরও কিছুক্ষণ আকাশটাকে মায়াবী করে রাখল। শেষে তারাও গেল। তাপ ফুরোলো, তাপবিদ্যুৎ কেন্দ্রগুলোর জমানো তাপের পুঁজিও শেষের মুখে। সমুদ্রপৃষ্ঠ জমে যাচ্ছে আস্তে আস্তে, ছোটখাটো গাছগুলো মরে গেছে। বড় বড় গাছেরা এখনও হয়তো বেঁচে থাকবে কয়েক দশক, কিন্তু সে সব দেখার জন্য মানুষ থাকবে না। আর কয়েক ডিগ্রি তাপমাত্রা নামলেই, চিরদিনের মতো শেষ হব আমরা। এখন, বহুদূরের নক্ষত্রগুলোর দিকে তাকালে মনে হয়, ওরা ভালো থাকুক। বেঁচে থাকুক।

এমন সময় কে যেন এসে খবর দিল তোমাকে, একজন মানুষ আলো হয়ে উঠেছে। সে নাকি বলছে, মানুষই সূর্য। এ আবার কী কথা? কোথায়? ওই তো, গঙ্গার তীরে বসে আছে সে – অন্ধকার আলো করে। দেখবে? শিগগির চলো। তুমি গিয়ে দেখলে, সত্যিই। গঙ্গার ধারে এলোমেলো শীর্ণ চেহারার মানুষটি বসে আছেন। তাঁকে দেখলে মনে হয়, সূর্য নেবে নি, তাঁর মধ্যে এসে গা ঢাকা দিয়েছে মাত্র। তবে সূর্য তো! তাই যেখানেই লুকোক, তার বিভা ঠিকরে বেরোয় – যেমন বেরোচ্ছে এই মানুষটির সমস্ত শরীর, চোখ মুখ থেকে এখন। মানুষটি থেকে থেকে কথা বলছেন, মৌমাছির মতো মানুষ বসে আছে তাঁকে ঘিরে। তাদের মুখ অন্ধকার, ব্যাকুল। অতিপাতি করে তারা খুঁজছে বেঁচে থাকার উত্তাপ, আলোটুকু। সেই আলোময় মানুষটিকে দেখে, কেবল দেখেই তোমার এখন একটু কম শীত করছে, আচমকা তোমার এও মনে হচ্ছে – এখনও বুঝি বেঁচে থাকার পথ আছে। কিন্তু তুমি, বা তোমার আশেপাশের কেউই জানো না – এই আলোর উদ্দেশ্য কী, বা মানুষটির থেকে আলো নিয়ে, কীভাবে নিজেদের কাছে রেখে দেবে আগামীদিনের জন্য।

এমনসময় সেখানে এক যুবক এল। তার মুখ অন্ধকার নয়, আবার ওই শীর্ণ মানুষটির মতো আলোকিত, প্রশান্তও নয়। সে যেন প্রচন্ড অস্থির – এই অন্ধকার পৃথিবীতে আলোর সন্ধান পেয়েও যেন সে পায়নি এখনও। চোখ, মুখ, শরীর থেকে একটা চাপা তেজ ফুটে বেরোচ্ছে। সে আসতেই, আগের মানুষটি স্পর্শ করলেন তাকে। এবার তেজে উদ্ভাসিত হল যুবকটি। সে বুঝেছে, সঠিক বুঝেছে সামনের এই সূর্যপ্রতিম মানুষটির আলোময় উপস্থিতির ইতিহাস, বর্তমান ও ভবিষ্যৎ। সে বুঝেছে, এই আলোমানুষের আলো কীভাবে ছড়িয়ে দেওয়া যেতে পারে সমগ্র জগতচালনায়, কীভাবে সেই আলোয় আবার ফুল ফুটবে গাছে, পাহাড় জেগে উঠবে, সমুদ্র তরঙ্গ তুলবে। উপস্থিত আঁধারমানুষদের উদ্দেশ্যে সেই যুবকটি কথা বলতে শুরু করলো – এই আলোকে সে কীভাবে বুঝেছে, আর আমরাই বা কী করে বুঝতে পারি। কী বিপুল তেজ সেই কথার। যে সূর্য এতক্ষণ নিহিত ছিল ওই মানুষটি বা এই যুবকটির মাঝে, এখন তার বাক্যে যেন অগ্নিস্ফুলিঙ্গের মতো ঠিকরে বেরোচ্ছে সে। আশেপাশের কত আঁধারমানুষ আলোকিত হয়ে উঠছে, তারা আর বসে থাকতে না পেরে ছুটে বেরিয়ে যাচ্ছে পৃথিবীটাকে আবার সচল করতে, পাহাড় টলাতে, সমুদ্র পেরোতে। জগতটা আর আগের মতো অন্ধকার লাগছে না তোমার। 

সেইসব মানুষেরা মশাল হাতে কাজে বেরিয়ে যেতে, যুবকটি শান্ত হল। ধ্যানস্থ হল আগের মানুষটির পাশে। তুমি এবার দেখলে, আরও দূরে দাঁড়িয়ে আছেন অসংখ্য, অগনিত আরও পুরুষ-নারী। পাহাড় টলানোর, সমুদ্রে তুফান তোলার সাধ বা সাধ্য তাদের নেই। কোনোভাবে এক মুঠো আলো পেলে, তারা তাদের সামান্য ঘরটুকু, বাকি জীবনটুকু চালিয়ে নিতে পারে। সেই আলোটুকু কি এই মানবসূর্যে তাদের জন্য রাখা নেই? তুমি দেখলে, এবার একজন মা এলেন সেই আলোকময় পুরুষের কাছে। তিনি প্রৌঢ়া, বয়সের কারণে পায়ে একটু ব্যথা ধরেছে। আলোময় মানুষটির কাছ থেকে আঁজলা ভরা আলো নিয়ে সেই মা একটু পা টেনে টেনেই গেলেন অসংখ্য অন্ধকার মানুষদের ভিড়ে। একে একে সবার মাথায় নিজের সেই আলোমাখা হাতটুকু বুলিয়ে দিলেন। কী আশ্চর্য, প্রতিবার হাত বোলানোর সঙ্গে সঙ্গে মায়ের হাতের আলো যেন বেড়ে চললো। আর গঙ্গাতীরের সেই আলোময় মানুষটি? একজনকে এত আলো ঢেলে দিয়েও কই, তিনি তো নিভে আসছেন না। বরং আরও, আরও উজ্জ্বল হয়ে উঠছেন। অন্ধকার মুখগুলোয় শান্তি এল অবশেষে। জগত জ্যোতির্ময় হল। 

আমি আমার মতো করে এই গল্প বললাম। আপনারা আপনাদের মতো করেও সাজিয়ে নিতে পারেন। এই গল্প বস্তুত কোনও মানুষের গল্প নয়, বরং আদর্শের গল্প, ভাবধারার গল্প। যে কোনও জীবনদায়ী ভাবধারায় তিনটি জিনিসের উপস্থিতি বাধ্যতামূলক – একটি আলোর উৎস, সেই আলোর ব্যাখ্যা, এবং সেই আলোর প্রয়োগ। কেবল আলো থাকলেই হয় না। আলোর কথা বলে বলে অন্যের মনে মশাল জ্বালতে হয়। তারপরেও যারা অন্ধকারে ডুবে থাকে, তাদের উঠোনে তখন নিজহাতে প্রদীপ জ্বেলে দিতে হয়। ঘর ও বাহির, দুইই আলোকময় হয় তখন। কাজ চলতে থাকে। পৃথিবীতে সূর্যোদয় হয়।

(শিল্পী – স্বামী তদাত্মানন্দ)

Comments