ডুব দাও
একটাতে দৃঢ় হও। ডুব দাও। না দিলে সমুদ্রের ভিতর রত্ন পাওয়া যায় না।
ইঁদুরদৌড়ের জগত। সবকিছুতে চৌকস হওয়ার জগত। খতিয়ে না জানলেও চলবে, কিন্তু কথা বলতে পারা চাই। না বুঝলেও চলবে, কিন্তু নম্বর আনা চাই। ছোটরা ছোট থেকে তাই ছুটছে – সোম আর শুক্র সকালে হিস্ট্রি, বিকেলে সায়েন্স আর সাঁতার, মঙ্গল আর বুধ ম্যাথস, টেবল টেনিস আর রবীন্দ্রসঙ্গীত, বৃহস্পতি করে যোগা, জিওগ্রাফি, পপুলার ডান্স। শনিবার লিটারেচার। রবিবার আগামী সেশনের কথা মাথায় রেখে টিউটোরিয়াল হোমে এডভান্স কম্পিটিটিভ ক্লাস।
অনাহত স্বরের মতো বাজতে থাকে – একটাতে দৃঢ় হও। ডুব দাও। না দিলে সমুদ্রের ভিতর রত্ন পাওয়া যায় না।
কিন্তু এসব তো মুখের কথা। আদতে হয় না। দিনে, রাতে শুধু যাওয়া আসা, শুধু স্রোতে ভাসা। বড় হতে হতে সাবজেক্ট কম্বিনেশন বদলে যায় হয়তো বা; জীবনের খুঁটিগুলো বদলে যায়। কিন্তু এই প্যাটার্ন বদলায় না। ছোটাছুটির খেলা চলতে থাকে। সব জায়গাতেই হয়ে উঠতে হবে Jack of all trades, master of none!
অনাহত স্বরের মতো বাজতে থাকে – একটাতে দৃঢ় হও। ডুব দাও। না দিলে সমুদ্রের ভিতর রত্ন পাওয়া যায় না।
অল্পবিদ্যা, 'মুখেন মারিতং জগত'-এ পারদর্শী প্রজন্মের পর প্রজন্ম। আর কে না জানে, অল্পবিদ্যা ভয়ঙ্করী! আর ভয়ঙ্করী বলেই, জীবন শেষ অবধি আমাদের ক্ষমা করে না। অর্থের চেয়ে বেশি অর্থমূল্যের পিছনে ছুটতে ছুটতে, মানুষের চেয়ে বেশি মুনাফায় বিশ্বাস করতে করতে, একটা কিছুর সবটা পাওয়ার চেয়ে সবকিছুকে একটু করে পাওয়ার ইচ্ছা করতে করতে, আমরা 'ইত: নষ্ট: তত: ভ্রষ্ট:' হয়ে পড়ে থাকি। শাম বা কূল, কিছুই আর থাকে না।
তাই, একটাতে দৃঢ় হও। ডুব দাও। না দিলে সমুদ্রের ভিতর রত্ন পাওয়া যায় না।
ইঁদুরদৌড়ের যুগে তুমি একা দৌড়তে না চাইলে জগত তো আর তোমার জন্য থেমে যাবে না। দৌড়ানোর, ক্ষণস্থায়িত্বের এই দর্শন না এলেই ভাল হত। কিন্তু এসেছে যখন, আমাদের কজনেরই বা আর সাধ্যে কুলোয় না দৌড়ে, সরে যাওয়া?
অর্জুনও তো শেষ মুহূর্তে সরেই যেতে চেয়েছিলেন যুদ্ধ থেকে। পেরেছিলেন কি? না। যুদ্ধ না হলেই ভাল হত, কিন্তু পরিস্থিতির সুর যেখানে যুদ্ধের, যুদ্ধে তোমায় নামতেই হবে। সেই সমরনীতি মেনে লড়া-ই একমাত্র কর্তব্য।
আমাদেরও কাজ সেরকমই। একটাতে দৃঢ় হও। ডুব দাও। সেই 'একটা' কী? পৃথিবীর প্রতিটি কাজের, ক্ষুদ্রাতিক্ষুদ্র কাজের একটি করে আদর্শ, একটি অন্তরাত্মা থাকে। থাকেই। না থাকলে সেই কাজটিই আর টিকে থাকতো না পৃথিবীর বুকে; কবে সে রুপালি চিতাভস্মের মতো সুবর্ণরেখার তীরে উড়তে উড়তে মিলিয়ে যেত বিশালে। আত্মবিহীন কেবল শরীরটিকে কি আমরা কখনও মানুষ বলি? শরীরের গোপনে আত্মা থাকে, তবেই না মানুষ? শরীরকে পেরিয়ে সেই ভিতরের মানুষটিকে জানা, তবেই না সত্যিকারের জানা?
তেমনই, প্রতিটা কাজের একটা শরীর আছে, আর একটা আত্মা। চরম ইঁদুরদৌড়ের যুগে যদি আমি একটি কাজের জন্য দিনে কেবল এক ঘন্টাও পাই, সেটুকু সময়েও যদি আমার উদ্দেশ্য থাকে প্রতিটি কাজের শরীর পেরিয়ে আত্মায় পৌঁছনো, যদি বহিরঙ্গকে অস্থায়ী জেনে ত্যাগ করার সততা ও অন্তরঙ্গে পৌঁছনোর নিষ্ঠা ও শ্রম আমার থাকে, শেষ অবধি পৌঁছতে পারি বা না পারি, এই উদ্দেশ্য আমাকে গভীরে নিয়ে যাবে। ডুব দিতে পারব। সমুদ্রের ভিতর রত্ন এখনও পাওয়া যাবে।
তাই, "একটাতে দৃঢ় হও। ডুব দাও। না দিলে সমুদ্রের ভিতর রত্ন পাওয়া যায় না।" সাকার ও নিরাকারবাদীদের উদ্দেশ্যে শ্রীরামকৃষ্ণ এই কথাটি বলেছিলেন, ১৮৮৪ সালের ১৯শে অক্টোবর। বড়সড় ধর্মীয় প্রসঙ্গের আড়ালে শ্রীরামকৃষ্ণ আমাদের সবার জন্য আসলে বলে চলেছিলেন জীবনচর্যার শাশ্বত নিয়ম। যখন যা করবে, আর সব ছেড়ে ঐটিকে আঁকড়ে ধরো। দই পাততে চাইলে, তোমার সঞ্চয়ে যেটুকু দুধ আছে, তাকেই ফেটাও মন দিয়ে। দই জমবে।
(শিল্পী - মৃণালকান্তি দাস)
Comments
Post a Comment