প্রসঙ্গ শিবরাত্রি
শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী স্বামী বিবেকানন্দকে ডেকেছিলেন 'মূর্ত মহেশ্বর' বলে। এক অপূর্ব ভজন রচনা করেছিলেন তিনি এই নামে। 'শিব' একটি ভাবনা, একটি চেতনাপ্রবাহ – তাঁর মূর্ত রূপ বিবেকানন্দ, এমন অনুভব করেছিলেন শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী।
রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ দর্শনের একটি গুরুত্বপূর্ণ দিক তার প্রায়োগিকতা। কদিন আগেই একটি রিফ্রেশার কোর্সের সুবাদে এক সন্ন্যাসী মহারাজের সঙ্গে কথা হচ্ছিল। তিনি ভারি সুন্দর বললেন – তত্ত্ব নিয়েই যখন কেবল আলোচনা করি, তখন রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ দর্শন থেকে আমরা one step removed; তাঁদের তত্ত্ব হল যাপিত সত্য।
এ কথা সহজেই বোঝা যায় বিবেকানন্দের বহু ধ্যানধারণাকে redefine করার প্রবৃত্তি লক্ষ্য করলে। 'বনের বেদান্তকে ঘরে আনতে হবে' – এইই ছিল তাঁর উদ্দেশ্য। অর্থাৎ, সংস্কৃত জানা পণ্ডিতদের জ্ঞানগর্ভ কচকচি থেকে বার করে এনে বেদান্তকে সাধারণের ব্যবহার্য করে তোলা। আরও সহজ ভাষায়, তত্ত্ব থেকে সত্যে প্রতিষ্ঠিত করা।
আজ শিবরাত্রি। সারা ভারতব্যাপী কোটি কোটি মানুষ আজকের দিনটি মানেন, শিবলিঙ্গে দুধ-জল ঢেলে পূজা করেন। ধর্মীয় প্রতিষ্ঠানগুলি রূপকার্থের এই পূজাগুলিকে ব্যবসায়িক লাভের জন্য ব্যাপকভাবে ব্যবহার করে, mass hysteria গড়ে, ভারতবর্ষের মতো দেশে একটি সুষম খাদ্যের প্রবল অপচয় ঘটায়। আমাদের বাড়িতে, মন্ত্রপাঠের হিড়িক বা উপবাসের বাহুল্য না থাকলেও, সামান্য দুধ-জল সমন্বিত পূজাই হয় আজকের দিনে। উপাচারকে সম্পূর্ণরূপে বর্জন করা সম্ভব হয় নি এখনও। এক অর্থে দেখতে গেলে, হয়তো অপচয়ের বৃহত্তর চালচিত্র থেকে নিজেদের একেবারে সরিয়ে আনতে পারিনি এখনও।
তবে আমি চেষ্টা করি আমার মতো করে শিবকে বুঝতে, এবং বছরের অন্যান্য দিনগুলোয় সেই শিবকে স্মরণে রাখতে। স্বামী বিবেকানন্দ redefine করেছিলেন শিবের ধারণা; সেই আলোয় বোঝার চেষ্টা করি। ১৮৯৭ সালে দেশে ফিরে রামেশ্বরম মন্দিরে তিনি যে বক্তব্য রেখেছিলেন, তা থেকে তাঁর 'শিব-সেবা'র ধারণা স্পষ্ট হয়ে ওঠে। নীচে সেই বক্তৃতার কিছু অংশ দিলাম, শিবকে বোঝার জন্য।
"দরিদ্র, দুর্বল, রোগী—সকলেরই মধ্যে যিনি শিব দর্শন করেন, তিনিই যথার্থ শিবের উপাসনা করেন। আর যে-ব্যক্তি কেবল প্রতিমার মধ্যে শিবের উপাসনা করে, সে প্রবর্তক মাত্র। যে-ব্যক্তি কেবল মন্দিরেই শিব দর্শন করে, সে ব্যক্তি অপেক্ষা যে জাতি- ধর্মনির্বিশেষে একটি মাত্র দরিদ্রকেও শিববোধে সেবা করে, তাহার প্রতি শিব অধিকতর প্রসন্ন হন।"
"যিনি শিবের সেবা করিতে ইচ্ছা করেন, তাঁহাকে শিবের সন্তানগণের সেবা সর্বাগ্রে করিতে হইবে—জগতের জীবগণের সেবা আগে করিতে হইবে।"
"কেহ ধার্মিক কি অধার্মিক—পরীক্ষা করিতে হইলে দেখিতে হইবে, সে ব্যক্তি কতদূর নিঃস্বার্থ। যে অধিক নিঃস্বার্থ সে-ই অধিক ধার্মিক, সে-ই শিবের সামীপ্য লাভ করে; সে পণ্ডিতই হউক, মূর্খই হউক, শিবের বিষয় কিছু জানুক বা না জানুক, সে অপর ব্যক্তি অপেক্ষা শিবের অধিকতর নিকটবর্তী। আর যদি কেহ স্বার্থপর হয়, সে যদি পৃথিবীতে যত দেবমন্দির আছে, সব দেখিয়া থাকে, সব তীর্থ দর্শন করিয়া থাকে, সে যদি চিতাবাঘের মত সাজিয়া বসিয়া থাকে, তাহা হইলেও সে শিব হইতে অনেক দূরে অবস্থিত।"
Comments
Post a Comment