যে যায়, সে যায়

যে যায়, সে যায়। যেতে হবে, এমন আভাস পেলে, প্রস্তুতি নিতে পারে কিছু কিছু। ঘরদোর গোছানো যায় কিছুটা, এরপর কার ভাগে কী কাজ থাকবে – ভাগ করে দেওয়া যায় কিছুটা। ডাক আচমকা এলে, এসব ছাড়াই যেতে হয়। মাথার কাছে আলনা অবিন্যস্ত, শেষ বিকেলের জামাকাপড় ভাঁজ করা বাকি। টেবিলে পড়ে থাকে নিত্যদিনের ওষুধের পাতা, অর্ধশূন্য জলের বোতল। ঘরে পরার চপ্পল আগুপিছু রাখা, শেষবার পা থেকে যেমন খোলা হয়েছিল। বইতে পেজমার্ক দেওয়া, সোফা-কভার টানটান করে রাখা বাকি, আগামী ২৮ তারিখ লন্ড্রিতে যাওয়ার দিন – ক্যালেন্ডারে দাগিয়ে রাখা। সবকিছুতেই "এই আসছি একটু" বলে চলে যাওয়ার ছাপ। যে যায়, সে যায়।

যারা পড়ে থাকে, তাদের এক আধটা অংশ ঠিক চলে যায় সেই মানুষটির সঙ্গে। পুরোনো দিনের সাক্ষাৎ, মাঝের দেখা-না-হওয়া, অভিমান, এই কদিন আগে আবার দেখা-হওয়ার প্রতিশ্রুতি, উপহারে তার হাতের লেখা, ভয়েস রেকর্ডিংয়ে তার কণ্ঠস্বর, তার ওষুধ না খেতে চাওয়া, নিয়ম না মানতে চাওয়া, সব কিছু মিলিয়ে যুঝতে যুঝতে, যে একরকম ভাবে গড়ে উঠেছিল বাকি সবার এক-একটি রূপ, ছাঁচ, বিম্ব – সে ভেঙে যায় তখন। যে যায়, তার যাওয়ার মধ্য দিয়ে অসীমের ডাক ভেসে আসে হু হু করে, যারা পড়ে রইল – তাদের কাছে।
সন্ত্রস্ত লাগে। অসীমের ডাক এলে, যা কিছু দিয়ে আমাদের ইহজগতের স্বপ্ন গড়া, সাধ্যসীমা ঠিক করা, তাদের ঠুনকো লাগে। অসার বলে বোধ হয়। একতলার ঘরে দুপুরের রোদ এসে পড়েছে। লোকজনের মাঝে বসে থাকা মানুষটি বলছেন, "বাজিকর এসে কত কত বাজি করে; আমের চারা, আম পর্যন্ত হল। কিন্তু এ-সব বাজি। বাজিকরই সত্য।" এক যুবক পালটা প্রশ্ন করছে, "জগৎ যদি মায়া — ভেলকি — এ মায়া যায় না কেন?" দোহারা চেহারার নরম সরম মানুষটি বলেন, "অনেক জন্ম এই মায়ার সংসারে থেকে থেকে, মায়াকেই সত্যি বলে মনে হয়। জলই সত্য। জলের ভুড়ভুড়ি – এই আছে, এই নাই; ভুড়ভুড়ি জলে মিশে যায়, — যে জলে জন্ম, সেই জলেই লয়।"

ঘরের দরজায় সন্তানহারা মা দাঁড়িয়ে থাকেন। পেটের সন্তানকে জলের ভুড়ভুড়ি ভাবতে কষ্ট হয় তাঁর। জলে ভেসে যায় চোখ। এত সব – বাজিকরের খেলা? বাজিকর 'লাগ লাগ' বলে ঢাকা খুলে দিল, আর কটা পাখি উড়ে গেল? ব্যাস, এটুকুই?

বিকেল হলে, চোখ মুছে ফেরার পথে পা বাড়ান শোকজর্জর সেই মা। ঘরের মানুষটির উদ্দেশ্যে বলেন "আসি আজ।" বলার ভাগ, তাই বলা। মানুষটি বলেন, "যাবে? বাইরে তো রোদ খুব। একটু বোসো। রোদ পড়লে যেও।"

বাজিকরের ভেলকির জগতে বাস আমাদের। ভেলকি ফুরিয়ে গেলে, পাখি উড়ে গেলে, দিশেহারা লাগে। অসীমের হু-হু ডাক বাজতে থাকে ডঙ্কার মতো – এক বাজিকরই সত্য, বাজিকরই সত্য। তবু, এই কঠিন কথাটি  বলারও রকমফের আছে। কেউ যদি এতকিছু বলেও, শেষে বলে, "বাইরে রোদ পড়লে তবে যেও", তার কাছে আরেকটু বসে যেতে ইচ্ছে করে তখন।

শুভংকর ঘোষ রায়চৌধুরী

Comments