'রাষ্ট্রদ্রোহ'

১৯১০ সালে লন্ডনের সুবিখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা 'স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড' একটি রিপোর্ট প্রকাশ করে। তাঁদের কার্যক্রমের কথা ভাবলে, বিষয়টি একটু অদ্ভুতই। 'রামকৃষ্ণ পরমহংস'। হঠাৎ তাঁকে নিয়ে গোয়েন্দা সংস্থার কী কাজ? সন্দেহ করার বীজ পাওয়া গেছে এই মানুষটির কাজেকর্মে – ব্রিটিশদের সোনার সাম্রাজ্য টলিয়ে দেওয়ার মতো সেইসব কাজ। রিপোর্টে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তার সিদ্ধান্ত জানায় – রামকৃষ্ণের মাতৃসাধনার উপাস্য কেবল মৃন্ময়ী প্রতিমার আড়ালের চিন্ময়ী রূপটি নয়। "Ramakrishna's deity was not any personal goddess. His Mother was basically his motherland." কোনও ব্যক্তিগত ঈশ্বরী নন; তিনি দেশমাতৃকা। 

সায়েবদের মধ্যে ঢিঢি পড়ে যায়। বছর কয়েকের মধ্যেই সেই রিপোর্ট এসে পৌঁছয় চার্লস টেগার্টের হাতে। সেইসময় তিনি কলকাতা পুলিশের ডেপুটি কমিশনার। এতটাই ভীত হয়ে পড়েন টেগার্ট এই রিপোর্ট পড়ে, এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট না করে তিনি গ্রেপ্তারি ওয়ারেন্ট বার করেন রামকৃষ্ণ পরমহংসের নামে। ধরে আনতে হবে তাকে। টেগার্টের জানা ছিল না, এই পরোয়ানা বেরোনোর তিন দশক আগেই ধরাছোঁয়ার বাইরে চলে গেছেন শ্রীরামকৃষ্ণ। টেগার্টকে হাস্যস্পদ করে এই ক্ষণজীবী অ্যারেস্ট ওয়ারেন্ট নিজের জায়গা করে নেয় পৃথিবীর পুলিশি ইতিহাসের সেই শেলফে, যেখানে হয়তো আর হাতে গোনা ওয়ারেন্ট পাওয়া যেতে পারে যা বেরিয়েছে মূল অভিযুক্তের প্রয়াণের এত বছর পর।

১৯১৮ সালে রাওলাটের নেতৃত্বে গঠিত সিডিশন কমিটি ভারতব্যাপী 'সন্ত্রাসবাদী' কাজকর্মের একটি রিপোর্ট পেশ করেছিল। সেই রিপোর্টে সবচেয়ে দীর্ঘ আলোচনা ছিল আমাদের এই বাংলাকে নিয়ে। ব্রিটিশ সাম্রাজ্যের ত্রাস হয়ে উঠছে 'Province of Bengal' – কলকাতায় বারীন ঘোষের হাত ধরে ছড়িয়ে পড়ছে আগুন। কিন্তু এই আগুনের পিছনে কারা mastermind? সিডিশন কমিটির রিপোর্ট আঙুল তুলছে দুজনের দিকে। এক, "Gadhadhar Chattopadhyay, alias Sri Ramakrishna" – কারণ? সাঙ্ঘাতিক! বাংলায় বিপ্লব আন্দোলনের জনক ইনি, বলছে সিডিশন কমিটি। এই মানুষটি মানুষকে আত্মশ্রদ্ধা শিখিয়েছেন। একেবারে শিরদাঁড়া মচকে যাওয়া একটা জাতকে শিখিয়ে দিয়েছেন জীবে প্রেম। শিখিয়েছেন, সব পথই নিয়ে যায় একই লক্ষ্যে। শিখিয়েছেন, নিজেকে গঠন করো আর অন্যকে গ্রহণ করো। শাসকদের জন্য এসব alarm call – নুয়ে পড়া জাতি একবার সোজা হয়ে দাঁড়ানোর integrity পেয়ে গেলে এদের রোখা মুশকিল। 


দ্বিতীয় যাঁর দিকে আঙুল তুলেছিল সিডিশন কমিটি, তিনি স্বামী বিবেকানন্দ। রিপোর্টে কমিটির ভাষা ছিল, "Vivekananda, after death, has become more dangerous than when he was alive." জীবিতাবস্থায় থাকলে তবু যদি বেঁধে রাখা যেত! But alas! সে গুড়ে বালি। মৃত্যুর পর তিনি ছড়িয়ে পড়ছেন ভাবনা ও শক্তির তরঙ্গ হয়ে, যুবকদের মনে মনে। বিপ্লবীরা একে অন্যকে গোপন চিঠি লিখছেন, পরশু অমুক সময়ে স্টেশন চত্বরের দক্ষিণের গেটে দাঁড়াবে। হাতে রাখবে বিবেকানন্দের বই। সেই দেখে চিনব, তুমি আমাদের লোক কিনা!

প্রত্যক্ষ partisan politics থেকে দূরে থাকতে চেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ। আর তাঁর গুরু? প্রায় অক্ষরজ্ঞানহীন, প্রত্যন্ত কামারপুকুরের এক 'পাগল সাধক'। অথচ, দুজনেই ধরেছিলেন রাজনীতিরও একেবারে গোড়ার নীতি – মানুষ তৈরি করা। মানুষের শিরদাঁড়া তৈরি করা। যত দিন যাচ্ছে, যত পৃথিবীব্যাপী সরীসৃপ বৃদ্ধি পাচ্ছে, পিঠে ছুরি মারার প্রবণতা যত বাড়ছে, তত প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে রামকৃষ্ণ-বিবেকানন্দ ভাবধারা। বর্তমান সমাজের সুবিধাবাদী শাসক ও তার স্তাবকদের জন্য আজ এই দুজন আরও ভয়ঙ্কর। 

আমরা যারা ঠাকুর, মা ও স্বামী বিবেকানন্দের এই ভাবধারার সান্নিধ্যে আসতে পেরেছি, মনে মনে তাঁদের গুরু বলে জেনেছি – আমরা যেন জানানোর চেষ্টা করে যাই, তাঁরা কী ছিলেন, এবং কেন ছিলেন। 

Comments