মৃত্যুচেতনার পাঠ: শ্রীরামকৃষ্ণ ও রবীন্দ্রনাথ
"বালক যখন কোনো দুর্বোধ ভাষার কাব্য শোনার পীড়া হতে মুক্তি প্রার্থনা করে তখন কাব্যপাঠ বন্ধ ক'রে তাকে যে মুক্তি দেওয়া যায় সে মুক্তির মূল্য অতি তুচ্ছ। কিন্তু সেই পাঠটিকে তার পক্ষে সত্য করে তুলে, পূর্ণ করে তুলে, তাকে যে মূঢ়তার পীড়া হতে মুক্তি দেওয়া হয় সেই হচ্ছে যথার্থ মুক্তি, চিরন্তন মুক্তি।"
'মুক্তির পথ' নিবন্ধে কথাগুলি বলছেন রবীন্দ্রনাথ। উপমাত্মক এই বক্তব্য নিয়ে সামান্য একটু ভাবলেই, মৃত্যুকে এই 'দুর্বোধ ভাষার কাব্য' বলে মনে হয়। আমরা – নিতান্ত বালক বালিকা – অনবরত প্রার্থনা করে চলেছি মৃত্যুর অদর্শনের। আরও ভাবলে দেখা যায়, আমরা প্রার্থনা যতটা না নিজের জন্য করছি, তার চেয়ে ঢের বেশি করছি যাঁদের নিয়ে আমাদের বেঁচে থাকা, তাঁদের জন্য। নিজমৃত্যুতে, যে 'আমি'টা জগৎকে এতদিন ধরে সাজিয়ে, ভালোবেসেছে, তা একবারেই নির্বাপিত হয়ে যায়। কিন্তু জগৎ বলে ভ্রমাত্মক বুদ্ধিতে যাঁদের সাজালাম, তাঁরা একে একে খসে পড়লে 'আমি'র সেই পৃথিবী একটু একটু করে ভাঙে। সে ভাঙনের মধ্য দিয়ে যাওয়া বেদনাদায়ক।
তবু, মৃত্যুর এই কাব্যপাঠ কি বন্ধ করা যায়? বরং, ওই উপরের কথাগুলির মতোই, মৃত্যুর পাঠকে আমাদের মতো করে, যার যার নিজের নিজের মতো করে সত্য করে তুললে তবেই এই পীড়া থেকে 'চিরন্তন মুক্তি'।
পীড়াটি মূঢ়তার, রবীন্দ্রনাথ বলছেন। এরই আরেক নাম 'অজ্ঞান'। কথামৃতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মুখে বারংবার কথাটি পাই। এই সময়েরই আশেপাশে (৫ আগস্ট, ১৮৮২) ঠাকুর বলছেন ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরকে –
"মৃত্যুকে সর্বদা মনে রাখা উচিত। মরবার পর কিছুই থাকবে না।"
'মৃত্যু' নামক অঘটনটি ঘটা কারো মর্জিমতো হয় না। তাই, ঠাকুরের কথায় – মৃত্যুর বাস্তবিক আঘাতের যে সাইক্লোন, তার ঝাপটা সামলানোর জন্য মৃত্যুকে 'সর্বদা মনে রাখা'র প্রয়োজন পড়ে। যে মৃত্যুগুলি আমরা পেরিয়ে এসেছি, যে মৃত্যু অবশ্যম্ভাবী – তারাই এই 'মনে রাখা'র সমষ্টি। মনে কি আমরা রাখছি না? রাখছি, বিরূপতায়। আজ বিরূপতা ছেড়ে তাকে 'কতদিন আসেন না' বলে জড়িয়ে ধরাও সহজ নয়। তাই – কেবল স্মরণে রাখা – সে আসবে, সে আসবে। এইই একমাত্র সত্য। আকাশ-পাতাল মিলে তাকে আটকাতে পারবে না। একমাত্র সত্য। আর সেই সত্যের জ্ঞানই অজ্ঞানের পার, 'চিরন্তন মুক্তি'।
মনে কেন রাখবো? ঠাকুর পরের বাক্যেই বলছেন, "(কারণ) মরবার পর কিছুই থাকবে না।"
'কিছুই থাকবে না'। অর্থাৎ জগৎ-সংসার মিথ্যা, মরীচিকা, অলীক, অসত্য। কিন্তু চোখের সামনে যা কিছু নিত্য বিদ্যমান, তাকে এক কথায় অসত্য বলে উড়িয়ে দেওয়ার মানুষ ঠাকুর নন। তাঁর ডাক্তারি চলতো 'আমি'টাকে নিয়ে, নিজেকে নিয়ে। পরিপার্শ্বকে তুড়ি মেরে গুরুত্বহীন করে দেওয়ায় মহত্ব বা ঔদার্য নেই কোনও। 'মৃত্যু ও অমৃত' নিবন্ধে রবীন্দ্রনাথ লিখছেন –
"যিনি গেলেন তিনি গেলেন বটে, কিন্তু সংসারে তো ক্ষতির কোনো লক্ষণই দেখি নে। সূর্যালোকে তো ক্ষতির কোনো কালিমা পড়ে নি, আকাশের নীল নির্মলতায় মৃত্যুর ঢাকা তো ক্ষতির একটি রেখাও কাটতে পারে নি, অফুরান সংসারের ধারা আজও পূর্ণে বেগেই চলেছে।" প্রসঙ্গত, শমীন্দ্রনাথের মৃত্যুতে রবীন্দ্রনাথ প্রায় এই এক কথাই বলেছিলেন।
পূর্ণজ্ঞানীর কথা আলাদা। সমাজ-সংসারবদ্ধ এই আমাদের কাছে তাঁর ভাবনা আদর্শ দিতে পারে, আশ্রয় নয়। তাহলে হিসেবটা গিয়ে এরকম দাঁড়ালো, যে সংসারকে প্রুফ দেখার নিয়মে 'ডিলিট' করে দেওয়া যায় না ঠিক। আমাদের জন্য সে থাকে, বহাল তবিয়তেই থাকে। তাই, মৃত্যুকে কেন স্মরণ করবো অহর্নিশ, এ প্রশ্নের উত্তর জগৎ-সংসারের থাকা বা না-থাকার নিরপেক্ষ হওয়া প্রয়োজন – যার উদ্দেশ্য কেবলমাত্র 'আমি', যার বিধেয় কেবলমাত্র 'আমার'। যারা থাকবে না।
রবীন্দ্রনাথ ওই একই নিবন্ধে লিখছেন ('মৃত্যু ও অমৃত') –
"তবে অসত্য কোনটা? এই সংসারকে আমার ব'লে জানা। এর একটি সূচ্যগ্রবিন্দুকেও আমার বলে আমি ধরে রাখতে পারব না। যে ব্যক্তি চিরজীবন কেবল ওই আমার উপরেই সমস্ত জিনিসের প্রতিষ্ঠা করতে চায় সেই বালির উপরে ঘর বাঁধে। মৃত্যু যখন ঠেলা দেয় তখন সমস্তই ধূলায় পড়ে ধূলিসাৎ হয়।"
ঠাকুর বিদ্যসাগরকে বলে চলেছেন, "আমি ও আমার এই দুটি অজ্ঞান। ‘আমার বাড়ি’, ‘আমার টাকা’, ‘আমার বিদ্যা’, ‘আমার এই সব ঐশ্বর্য’ -- এই যে-ভাব এটি অজ্ঞান থেকে হয়। ... যেমন পাড়াগাঁয়ে বাড়ি -- কলকাতায় কর্ম করতে আসা। বড় মানুষের বাগানের সরকার, বাগান যদি কেউ দেখতে আসে, তা বলে ‘এ-বাগানটি আমাদের’, ‘এ-পুকুর আমাদের পুকুর’। কিন্তু কোন দোষ দেখে বাবু যদি ছাড়িয়ে দেয়, আর আমের সিন্দুকটা লয়ে যাবার যোগ্যতা থাকে না; দারোয়ানকে দিয়ে সিন্দুকটা পাঠিয়ে দেয়।"
মহাকাল, মৃত্যু, ঈশ্বর হলেন সেই 'বাবু' – অতর্কিতে এসে উপস্থিত হন 'দুঃখরাতের রাজা'। এসে, তিনি কী চান? গুনে গুনে সমস্ত ধন-জন-সম্পত্তির পাই-পয়সা তাকে চুকিয়ে দিতে হয় না; যে অহংকারে এতদিন এদের 'আমার' বলে দাবি করে এসেছি আমরা, সেই অহংকারটুকু তাঁর পায়ে সঁপে দিলেই যথেষ্ট। তিনি চান 'অহং'য়ের নিরঙ্কুশ সমর্পণ।
নিজের পিতৃবিয়োগের বৎসরান্তে রবীন্দ্রনাথ লিখে রাখছেন ('মৃত্যুর প্রকাশ' নিবন্ধে) – "জীবনের ব্রত অতি কঠিন ব্রত, এই ব্রতের ক্ষেত্র অতি বৃহৎ, এর মন্ত্র অতি দুর্লভ, এর কর্ম অতি বিচিত্র, এর ত্যাগ অতি দুঃসাধ্য।" সম্পদে-বিপদে হাল ধরে থাকার একমাত্র পথ এই ব্রতের ক্ষেত্র, মন্ত্র, কর্মপ্রণালীকে এক সূত্রে বাঁধা। শেষের সেই ত্যাগ, সমর্পণ তবেই সম্ভব।
Comments
Post a Comment