ধর্মের সত্যতা

১২৮ বছরে পদার্পণ করল স্বামী বিবকানন্দের বিনিদ্র স্বপ্ন ও শ্রমের ফসল, রামকৃষ্ণ মিশন। প্রথমবার বিদেশে থাকাকালীনই স্বামীজী চিঠি মারফৎ মঠস্থ গুরুভায়েদের জানিয়েছিলেন তাঁর সঙ্ঘস্থাপনের ইচ্ছার কথা।

Organisational ভাবনাচিন্তা এ দেশের সন্ন্যাসীদের কাছে তখন নিতান্তই অপরিচিত। গুরুর আদেশ মেনে, আত্মজ্ঞানলাভের উদ্দেশ্যে নীরবে, নিভৃতে সাধন-ভজন করাই সন্ন্যাসমার্গের সড়ক বলে পরিগণিত হত। তাই, স্বামীজীর সঙ্ঘনির্মাণের ভাবনায় তাঁর সতীর্থ, অতি আপনজনেদেরও যে প্রথমে কিঞ্চিৎ ভ্রুকুঞ্চন হয়েছিল – সে আশ্চর্যের নয়। 

তবে বিবেকানন্দ সঙ্ঘপ্রতিষ্ঠার কাজে তৎপর হওয়ারও অনেক আগে, শ্রীশ্রী মায়ের একটি আধোস্ফুট, ঐকান্তিক প্রার্থনায় সঙ্ঘের বীজটি পাওয়া যায়। ঠাকুরের দেহাবসানের পর যখন তাঁর ত্যাগী সন্তানেরা অপরিসীম অর্থাভাব, অন্নাভাব ও মানসিক দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে যাচ্ছেন, তাঁদের কষ্ট দেখে মা ঠাকুরের কাছে যে প্রার্থনাটি করেছিলেন, তা হল – ‘তোমার নামে যারা বেরুবে তাদের মোটা ভাত-কাপড়ের অভাব যেন না হয়। ওরা সব তোমাকে, আর তোমার ভাব উপদেশ নিয়ে একত্র থাকবে। আর এই সংসারতাপদগ্ধ লোকেরা তাদের কাছে এসে তোমার কথা শুনে শান্তি পাবে।’ 

প্রার্থনাটি বারবার অনুধাবন করলে, দুটি বিষয় স্পষ্ট হয় –
১। ত্যাগী শিষ্য ও ভক্তদের জীবনধারণের জন্য অন্ন, বস্ত্র ও মাথার উপর একফালি ছাদের (‘একত্র থাকবে’) অভাব যেন না হয়;
২। সংসারের ত্রিতাপদগ্ধ মানুষের সঙ্গে সন্ন্যাসী সন্তানদের একটি মিলনস্থল যেন থাকে।

মায়ের প্রার্থনায় সঙ্ঘের বীজ যেভাবে ধরা দেয়, তার কেন্দ্রে উপবিষ্ট শ্রীরামকৃষ্ণের ভাব। এই ভাবেরই প্রচার ও প্রসারে সন্ন্যাসী সন্তানেরা ঘর ছেড়ে বেরোবেন, আবার সেই ভাবেরই ছায়ায় গৃহী সন্তানেরা মিলিত হবেন সন্ন্যাসীদের সঙ্গে, প্রাণ জুড়োবেন সেই সংস্পর্শে। 

পরবর্তীকালে বিদেশ থেকে শশী মহারাজকে লেখা চিঠিতে ভাবী সঙ্ঘের কর্মপ্রণালী কেমন হবে, তা বলতে গিয়ে বিবেকানন্দ কর্মের ভিন্নতার নিরিখে সঙ্ঘে তিনটি বিভাগ রাখার কথা উল্লেখ করেন –
১) বিদ্যা বিভাগ – গৃহী ও সন্ন্যাসী উভয়ের জন্যই বৈদান্তিক দর্শন, শাস্ত্র ও যা-কিছু রামকৃষ্ণ ভাবধারার আকর, তার অধ্যয়ন ও চর্চা।
২) প্রচার বিভাগ – কেবলমাত্র ঘরে বসে পাঠে নিজেকে সীমাবদ্ধ না রেখে, লোকহিতার্থে এই ভাবের প্রচার নানা জায়গায় করা, ও প্রসার ঘটানো।
৩) সাধন বিভাগ – সন্ন্যাসীদের ব্যক্তিগত আধ্যাত্মিক সাধনা ও উৎকর্ষতা সম্পাদন।

লক্ষণীয়, এ যাবৎ যাযাবর, ভিক্ষা করে খাওয়া, লোকসমাজ থেকে দূরে নির্জনে নিজমুক্তির জন্য সন্ন্যাসীদের সাধনাকে সঙ্ঘের শিকড়ে নিয়ে এলেন বিবেকানন্দ, এবং সাধনা হয়ে উঠল সঙ্ঘের অনেকগুলি কাজকর্মের একটি ভাগ। ‘সাধন বিভাগ’-এর মধ্য দিয়ে যদি ‘আত্মনোমোক্ষার্থং’ ভাবটি প্রবাহিত হয়, ‘বিদ্যা বিভাগ’ ও ‘প্রচার বিভাগ’-এ বিবেকানন্দ নিহিত রেখেছিলেন ‘জগদ্ধিতায় চ’ ভাবটি। এই দুয়ের সমন্বয়েই গড়ে উঠেছিল তাঁর স্বপ্নের সঙ্ঘ। 

শ্রীরামকৃষ্ণের অভ্যন্তরস্থ অনন্ত ভাব ও শক্তির যে নানারূপ প্রকাশ, তাকে গোঁড়ামি বা যুক্তিহীন অলৌকিকতার বয়ানে প্রচার করাকে রুচি-বিগর্হিত মনে করতেন বিবেকানন্দ। গোঁড়া না হওয়ার বিষয়ে বারংবার চিঠিতে সাবধান করে গেছেন শিষ্য ও সতীর্থদের, মানুষের সেবা করতে গিয়ে যেন প্রথমেই মানুষকে ঘাড় ধরে রামকৃষ্ণের ‘cult’-এ বিশ্বাস করানোর মতি রামকৃষ্ণ-সন্তানদের না হয় – ‘Do not insist upon every-body’s believing in our Guru’. ভক্তিভাব ও ঈশ্বরবিশ্বাসের জায়গা থেকে যে রামকৃষ্ণ-ভক্তেরা ঠাকুরের নানা অলৌকিক কৃপা অনুভব করে তার প্রচার করেছিলেন, সেই ব্যক্তিগত উপলব্ধিকে কিছুমাত্র অশ্রদ্ধা না করেও স্বামীজী লিখছেন, ‘আহাম্মকেরা সব তালগোল পাকিয়ে খিচুড়ি করে ফেলবে।’ তার অব্যবহিত পরে, ১৮৯৪ সালের ৩০ নভেম্বর তারিখে লেখা স্বামীজীর ওই চিঠিতে যে বাক্যটি পাওয়া যায়, তা আজকের ধর্মান্ধ পৃথিবীতে তিনি বললে সম্ভবত তাঁর নামে ফতোয়া জারি করতে নানা ধর্মের কট্টরপন্থীরা এক হয়ে যেতেন। কথাটি ছিল – ‘অলৌকিক ঘটনার সত্যতা প্রমাণ করতে পারলেই তো আর ধর্মের সত্যতা প্রমাণিত হয় না।’ 

এত স্পষ্টভাবে, দ্ব্যর্থহীন ভাষায় ধর্মকে অলৌকিকতার কবল থেকে মুক্ত করেছেন কোন ধর্মনিষ্ঠ আস্তিক, তা রীতিমতো ভেবে দেখার বিষয়। বর্তমান সময়ে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতায় বুঝতে পারি, গোঁড়া ধার্মিক ও গোঁড়া নাস্তিক আসলে অশ্বক্ষুরাকৃতি হ্রদের দুইদিকের দুটি অন্তিম বিন্দুর মতো। এদের কাছে ধর্মের অর্থই অলৌকিকতা। একদল তার নিরিখেই ধর্মকে গ্রহণ করে, আরেকদল বর্জন করে – তফাৎ এইটুকু। ভাগ্যক্রমে আধুনিক ভারতের ইতিহাসে একজন বিবেকানন্দ ছিলেন যিনি নিজে অলৌকিকতা প্রত্যাখ্যান করে তা সর্বসমক্ষে বুক ঠুকে বলতে পেরেছিলেন। হাওড়ার সাব-রেজিস্ট্রি অফিসে ১৯০১ সালের ৩০ জানুয়ারি ও ৬ ফেব্রুয়ারি রামকৃষ্ণ সঙ্ঘের দলিলপত্র তৈরি করে আনুষ্ঠানিক রেজিস্ট্রেশন হচ্ছে যখন, সঙ্ঘ কোন ধর্ম পালন করবে, তা লিখিতভাবে উল্লেখ করেন বিবেকানন্দ – ‘the religion of Ramakrishna’। কেমন হবে সেই ধর্ম? শ্রীরামকৃষ্ণ তো কেবল হিন্দুধর্মের সম্পত্তি করে রাখেন নি নিজেকে, সব ঘরেই ঘুঁটি ফেলেছিলেন। তাঁর ধর্ম কোনও একটি মতের শ্রেষ্ঠত্বে নয়, নিহিত ছিল অপরিবর্তনশীল, অপরিহার্য আদর্শ ও মূল্যবোধে। তাকে ধর্ম বলি তো ধর্ম, প্রেম বলি তো প্রেম, ঈশ্বর বলি তো ঈশ্বর।

তাই, ১৮৯৭ সালে আজকের দিনে বাগবাজারে বলরাম বসুর বাড়িতে (আজ যাকে আমরা বলরাম মন্দির বলে জানি) মিশনের উদ্দেশ্য ও ব্রত হিসাবে স্বামীজী যা নির্ধারণ করেছিলেন, তাতে শ্রীরামকৃষ্ণের ধর্মের এই বৈশিষ্ট্যই প্রকট হয়। উদ্ধৃত করছি –

“উদ্দেশ্যঃ মানবের হিতার্থ শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যে-সকল তত্ত্ব ব্যাখ্যা করিয়াছেন এবং কার্যে তাঁহার জীবনে প্রতিপাদিত হইয়াছে, তাহার প্রচার এবং মানুষের দৈহিক, মানসিক ও পারমার্থিক উন্নতিকল্পে যাহাতে সেই সকল তত্ত্ব প্রযুক্ত হইতে পারে, তদ্বিষয়ে সাহায্য করা … 

ব্রতঃ জগতের যাবতীয় ধর্মমতকে এক অক্ষয় সনাতন ধর্মের রূপান্তরমাত্র-জ্ঞানে সকল ধর্মাবলম্বীদিগের মধ্যে আত্মীয়তা-স্থাপনের জন্য শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ যে কার্যের অবতারণা করিয়াছিলেন, তাহার পরিচালনা …”

ভগিনী নিবেদিতার কাছে বিবেকানন্দ যেমন ছিলেন ‘ঘনীভূত ভারতবর্ষ’, বিবেকানন্দের কাছে তেমনই রামকৃষ্ণ ছিলেন ঘনীভূত আদর্শ, প্রেম, চিত্ত। তাই বিখ্যাত আরাত্রিক ভজনে রামকৃষ্ণের বর্ণনায় বিবেকানন্দ লেখেন ‘জগভূষণ চিদঘনকায়’। যে যে অলঙ্কারে এই জগতকে সুন্দর করে তুলতে পারি আমরা, সে তুমিই। যে অরূপ মন সুন্দরতম, তা-ই যেন ঘনীভূত হলে তোমার মতো দেখায়। শ্রীরামকৃষ্ণকে আদর্শরূপে দেখার যে নিরলস প্রয়াস, তা থেকেই বিবেকানন্দ লিখতে পারেন – ‘The disciples of all the prophets have always inextricably mixed up the ideas of the Master with the person and at last killed the ideas for the person. The disciples of Sri Ramakrishna must guard against doing the same thing. Work for the idea, not the person.’

এই আদর্শের নিরবচ্ছিন্ন চর্চার একটি কেন্দ্র থাকার প্রয়োজন অনুভব করে বিবেকানন্দ স্বপ্ন দেখেছিলেন এক সঙ্ঘের। সেটিই রামকৃষ্ণ মিশন। সময়ের সঙ্গে সঙ্গে সঙ্ঘের গণ্ডী পেরিয়ে সেই আদর্শ আজ পরিব্যপ্ত বৃহত্তর ব্যষ্টিমানসে। তাই, আবার ফিরে দেখা যেতে পারে বিবেকানন্দের সেই স্বপ্নকে, আর তারপর, আজকের পরিস্থিতিকে। সেইমতো স্বাধীন ভাবে নিজেদের গড়ে তোলা যেতে পারে।

(ছবির সৌজন্য – 'উদ্বোধন')

Comments

  1. বাহ্! এই ধরনের লেখার খুব প্রয়োজন ছিল। খুব ভালো। খুব ভালো।

    ReplyDelete

Post a Comment