আত্মবিদ্যা

ভারতীয়দের কেমন শিক্ষা প্রয়োজন, কেউ জিজ্ঞেস করলেই স্বামী বিবেকানন্দ বলতেন – দু রকম শিক্ষা তাদের প্রাপ্য। এক, জাগতিক বিদ্যাশিক্ষা; দুই, আত্মবিদ্যা

জাগতিক বিদ্যাশিক্ষার দিকটি খুব স্পষ্ট – সমাজে স্বাবলম্বী হয়ে উপার্জন করা ও জীবনধারণ করার উদ্দেশ্যে বিজ্ঞান, ভূগোল, সাহিত্য, গণিত, ইতিহাস, ইত্যাদির পাঠ নেওয়া।

অন্যদিকে, 'আত্মবিদ্যা'কে স্বামীজী সময়বিশেষে ধর্মবিদ্যাও বলতেন, এবং বলেই সাবধান করে দিতেন – "ঐ কথা বললেই যে জটাজট, দন্ড, কমন্ডলু ও গিরিগুহা মনে আসে, আমার মন্তব্য তা নয়।"

এত বলে, স্বামীজী অপেক্ষা করতেন না কবে প্রশ্নকর্তা কবে ফিরে প্রশ্ন করবেন, "তাহলে আত্মবিদ্যা বিষয়টা কী?" নিজ দেশবাসীর মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কথাগুলিকে ভুল-বোঝার প্রবণতা এবং নিজেকে শুধরে নেওয়ার অনীহা বিষয়ে স্বামীজী এত নিশ্চিত ছিলেন, যে নিজেই আরও ব্যাখ্যা করে দিতেন নিজকথার – 
যে জ্ঞানে ভববন্ধন থেকে মুক্তি পর্যন্ত পাওয়া যায় ... এই জীবাত্মাতেই অনন্ত শক্তি নিহিত আছে, পিপীলিকা হতে উচ্চতম সিদ্ধপুরুষ পর্যন্ত।

আমার প্রকৃত স্বরূপ যে আমার অন্তরস্থ চেতনা-চৈতন্য; শুধু আমার নয়, বিশ্বজোড়া সমস্ত জীবেই যে সেই একই চৈতন্যশক্তি বর্তমান – এটি বোঝা, এবং বুঝে নিজের সঙ্গে অপরকে স্বরূপত অভিন্ন বলে জানা – এর নাম আত্মবিদ্যা। আত্মবিদ্যা লাভ করলে 'পর' বলে আর কেউ থাকে না, স্বরূপ তো সকলেরই এক তখন। সকলেই 'আত্ম' হয়ে ওঠে। তাই, 'আত্মবিদ্যা' কথাটির মধ্যে 'আত্ম' থাকলেও, তা কেবলমাত্র নিজেকে জানার বিদ্যা নয়; তা জগৎকে, ব্রহ্মাণ্ডকে আত্ম বা আপন করে জানার বিদ্যা। 

প্রসঙ্গত, মনে রাখা যেতে পারে, একটি বক্তৃতায় স্বামীজী এও বলছেন – উপনিষদ আমাদের দুটি মূল শিক্ষা দেয়। আত্মা/চৈতন্যশক্তির অবিনশ্বরতা (Immortality of the Soul); এবং সর্বভূতে অভিন্নতা (Oneness of Beings)। আত্মবিদ্যা বলে যার কথা আমরা একটু আগে জানলাম, তা এই দুটি স্তম্ভের উপরেই প্রতিষ্ঠিত – দেহমনের জন্মমৃত্যুর অতীতে এক ও অদ্বিতীয় চৈতন্যশক্তি সারা বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে প্রবাহিত হয়ে চলেছে – এইটি জানা, এবং সেই চৈতন্যশক্তি সর্বভূতে প্রকাশিত হচ্ছে বলে বহিরঙ্গের বৈচিত্র্য থাকলেও আমরা সকলেই স্বরূপত এক ও অভিন্ন – এইটি জানা।
এত অব্দি তো তবু বুঝলাম। কিন্তু কোন যুক্তিতে আত্মবিদ্যা ধর্মবিদ্যা হতে যাবে? ধর্ম মানে তো ... টিকি-তিলক-ফেজটুপি-ঘন্টা-ফুলমালা-পুজোআচ্চা-নামাজ-সার্মন-উপবাস-উপবীত এইসব? এইসবও আত্মবিদ্যা...?

এইখানেই আমাদের বোঝায় একটা মারাত্মক ভুল থেকে যায়। 'ধর্ম' বলতে আমরা সাধারণভাবে আচার-উপাচার (rituals) বা সাজসজ্জা বুঝে থাকি আজকাল, ভারতে 'ধর্ম' কথাটির অর্থ কখনোই তা ছিল না। ঔপনিবেশিকতার কুফলগুলির মধ্যে একটি এইটি – প্রাচ্য ভাবটিকে পাশ্চাত্য ভাব দ্বারা গ্রাস করা। যেমন রবীন্দ্রনাথ তাঁর 'আত্মশক্তি' প্রবন্ধে বলছেন ভারতীয় 'দেশ' ও পাশ্চাত্যের 'নেশন' সম্পূর্ণ আলাদা দুটি ধারণা, যেমন একেবারে বিপরীত ভারতীয় 'জাতি' ও পাশ্চাত্য 'রেস', তেমনই ভারতীয় 'ধর্ম' ও পাশ্চাত্যের 'রিলিজিয়ন' ভিন্নার্থক।

'New World Encyclopedia' মারফৎ জানা যায়, Religion "denotes a set of common beliefs and practices pertaining to the supernatural (and its relationship to humanity and the cosmos), which are often codified into prayer, ritual, scriptures, and religious law." ষোড়শ শতাব্দীতে পর্তুগিজ মিশনারিদের হাত ধরে ভারতে প্রথম আসে 'Religion' শব্দটি, ঔপনিবেশিক আধিপত্যের জেরে 'ধর্ম' শব্দটির উপর কোপ পড়ে।

কিন্তু ভারতের আধ্যাত্মিক ইতিহাসে 'ধর্ম' কথাটি কখনও 'Supernatural' নিয়ে ব্যস্ত হয়নি। আমাদের আপাত-সত্য, ক্রমঅপসৃয়মান, ক্ষয়িষ্ণু জীবনবৈচিত্র্যের অতীতে এক উচ্চতর সত্য চিরায়মান ও কার্যকরী – এই কথাটি উপলব্ধি করার পথের নাম ছিল 'ধর্ম'। সেই সত্যকে কেউ নিজ ইষ্টদেবতার রূপে দর্শন করে তাঁর অর্চনা করে উপলব্ধি করতে পারেন, কেউ সত্যের পরম ও নিরাকার ধারণাটিকে বারংবার মনন করার মাধ্যমে উপলব্ধি করতে পারেন, কেউ এর কিচ্ছুটি না করে কেবল নিজপথে সৎ থেকে, শ্রদ্ধাশীল থেকে সেই সত্যে সম্পৃক্ত আদর্শগুলোর আচরণের মধ্য দিয়ে তাকে উপলব্ধি করতে পারেন। 'ধর্ম' এর কোনও একটি পথকেই মান্যতা দেয় নি, কোনও পথকেই সে প্রত্যাখ্যান করেনি। উপনিষদ, গীতা বা বৈদান্তিক শাস্ত্রসমূহে 'ধর্ম' তাই উচ্চতম আদর্শ ও মূল্যবোধে কর্ষিত জমিতে প্রতিষ্ঠিত এক সমদর্শী, দেবত্বদর্শী জীবনচর্যার অপর নাম। ধর্মের ভিত্তিপ্রস্তর নিঃস্বার্থপরতা, ও তাতে অধিষ্ঠিত বৈরাগ্য, প্রেম ও ত্যাগে।

এই নিঃস্বার্থপরতা কখন আসবে? 
যখন স্বার্থবোধ থাকবে না।
স্বার্থবোধ কখন থাকবে না?
যখন আপন-পর ভেদ থাকবে না।
আপন-পর ভেদ কখন থাকবে না? 
যখন নিজেকে ও বাকি সকলকে অভিন্ন বলে জানবো।
এই শিক্ষার নাম কী?
আত্মবিদ্যা।

তাই, স্বামীজীর কথায়, আত্মবিদ্যা ও ধর্মবিদ্যা বস্তুত অভিন্ন। একটির উপলব্ধি অন্যটির সূচক – আপনাকে সঠিক জানলে পরকেও জানা যায়, আর তখন পরকে ভালোবাসলে আপনাকেই ভালোবাসা হয়। 

এই জমির উপর দাঁড়িয়ে আমাদের বিবেকানন্দ বলেন, আমি সেই ঈশ্বরের পূজা করি, যাকে তোমরা ভ্রমবশত মানুষ বলে থাকো। সত্য, ঈশ্বর, পর ও আপন – সবই এক, এই অসম্ভব বিশ্বাসের উপর দাঁড়িয়ে বিবেকানন্দ চিঠি লেখেন বন্ধু প্রমদাদাস মিত্রকে, পরোপকারই ধর্ম, বাকি যাগযজ্ঞ সব পাগলামো।

Comments