'এই টানটুকু নাও'
উত্তরাখণ্ডের মায়াবতীতে স্বামী বিবেকানন্দ অদ্বৈত আশ্রম স্থাপন করেছিলেন তাঁদের জন্য, যাঁরা নিরাকার ব্রহ্মের উপাসনা করতে চান। কিন্তু একদিন দেখলেন, সেখানেও শ্রীরামকৃষ্ণের পট রাখা উপাসনাঘরে। কিছুটা ক্ষুণ্ণ হয়ে স্বামীজী বলেছিলেন, "আমি ভেবেছিলাম অন্ততঃ একটি কেন্দ্রেও তাঁর বাহ্যপূজাদি বন্ধ থাকবে। কিন্তু হায়, হায়, গিয়ে দেখি বুড়ো সেখানেও জেঁকে বসে আছেন।"
ঠাকুরের পট মায়াবতীতে থাকবে কিনা, এই প্রশ্নের মীমাংসা করেছিলেন মা। "আমাদের গুরু যিনি তিনি ত অদ্বৈত। তোমরা সেই গুরুর শিষ্য, তখন তোমরাও অদ্বৈত বাদী।" সেই থেকে অদ্বৈত আশ্রমে স্বামীজী ও মায়ের কথা ধরে, ঠাকুরের ছবি আর রাখা হয় নি।
তবে এমনিতে অদ্বৈতবাদীদের সঙ্গে দ্বৈতবাদীদের খুব বিরোধ। নিরাকারে বিশ্বাসী অদ্বৈতবাদীরা এ ব্যাপারে একটু উন্নাসিক; তাঁদের মতে – ঈশ্বর যদি একই হন, তবে খামোকা তাঁকে পঞ্চাশটা নামে ডেকে, মিথ্যে মিথ্যে পুতুল-পুজোর কী দরকার? অবস্থা এমন, যে এভাবে চললে কাজিয়া আর সালিশিতেই রাত কাবার!
এই যুগ-যুগান্তরব্যাপী মুশকিল আসান করে গিয়েছিলেন স্বয়ং ঠাকুর। ভৈরবী ব্রাহ্মণী তাঁর জীবনের প্রথম গুরু, তাঁর কাছে রামকৃষ্ণের সাকার সাধনা; আবার ব্রহ্মজ্ঞ সাধু তোতাপুরীর কাছে নিরাকার সাধনা।
নিরাকারবাদীদের ঠাকুর বলছেন, সাকার উপাসনার আত্মা তার বাহ্যিক আড়ম্বরে নয়, অন্তরের ঐকান্তিক ভক্তিতে। তেমনই, নিরাকার উপাসনার আত্মা তার মূর্তি-বিমুখতায় নয়, ঐকান্তিক আত্মজিজ্ঞাসায়।
ঠাকুর বলছেন – "রাধাকৃষ্ণ মানো আর নাই মানো, এই টানটুকু নাও ...। ব্যাকুলতা থাকলেই তাঁকে লাভ করা যায়।"
সাকার-সাধনার আচার উপাচার, আর নিরাকার-সাধনার শুষ্কতা – দুইই মুছে দিলেন ঠাকুর। এগুলি তো পথ কেবল, নিজের নিজের মতো করে স্বতন্ত্র। কিন্তু অভীষ্ট বস্তুলাভের জন্য এক ও একমাত্র প্রয়োজন টান। দুই পথেরই শেষ দেখে আসা এই মানুষটি বুঝেছিলেন, ব্যাকুলতাই হল সব পথের মূল। সাকারবাদীকে যেমন ঝেড়ে ফেলতে হবে আচারসর্বস্বতা, নিরাকারবাদীকে তেমন আঁকড়ে ধরতে হবে কৃষ্ণের প্রতি শ্রীরাধিকা ও গোপীদের টান – নিজের স্বরূপ সে খুঁজবে সেইরকম ব্যাকুল হয়ে। পথ যেমনই হোক না কেন – সত্যিকারের টান থাকলে গন্তব্য আসবেই।
আমাদের জীবনেও, একটি পথ ঠিক হলে অন্যটিকে বেঠিক হতে হয় না। একজনের ভালোলাগা সত্যি হলে, অন্যজনেরটা মিছে হয়ে যায় না। ডাক্তার হও বা বৈজ্ঞানিক, ইঞ্জিনিয়ার বা শিক্ষক, গায়ক বা খেলোয়াড়, অভিনেতা বা আঁকিয়ে – তোমার পথের প্রতি তোমার টান আছে তো? লক্ষ্যবস্তুকে পাওয়ার জন্য ব্যাকুল তো তুমি? ওইটুকু তোমার মধ্যে থাকলে, অভীষ্ট তুমি লাভ করবেই।
অভীষ্ট কী? – আনন্দ। ঈশ্বর।
Comments
Post a Comment