মার্গারেট নোবেল-কে লেখা বিবেকানন্দের প্রথম চিঠি
১৮৯৫ সালে লন্ডনে প্রথম স্বামী বিবেকানন্দের বক্তৃতা শোনেন মার্গারেট নোবেল। তেমন একটা ভালো লাগেনি। মনে হয়েছিল – আবার দর্শনের একপ্রস্থ কচকচি! নিশ্চয়ই কোনও এক সম্প্রদায়ের ধর্মীয় নেতা, ভক্ত জোটাতে বিদেশ এসেছেন।
কিন্তু সমাপতনই বলি, আর যা-ই বলি, ভালো না লাগলেও মার্গারেট সেদিনের পরেও সন্ন্যাসীটির আরও কিছু বক্তৃতায় পৌঁছে গিয়েছিলেন কীভাবে যেন! হয়তো এমনটা হওয়ারই ছিল।
যত বেশি মার্গারেট শোনেন তাঁর কথা, তত মনে হয় – কই, এঁকে যেমনটা ভাবছিলাম শুরুতে, তেমন তো ইনি নন। তাঁকে গড়পড়তা ধর্মীয় নেতা ভাবার সেই ভ্রম মার্গারেটের কেটে গিয়েছিল অল্প কদিনের মধ্যেই। ধর্ম নিয়ে সন্ন্যাসীটি আলোচনা করতেন বটে, কিন্তু সে এমন এক ধর্ম যার কথা মার্গারেট কেন, অনেকেই আগে শোনেনি। গৈরিক বসনে আবৃত সেই সন্ন্যাসীর ধর্মপ্রসঙ্গ শুরু হতো মানুষের কথা বলে, শেষ হতো মানুষের কথা বলে। দূরে, স্বর্গে অধিষ্ঠিত ঈশ্বরের কথা তিনি বলতেন না; বরং বলতেন, তাঁর ঈশ্বর অধিষ্ঠিত এই চারপাশে হেঁটে চলে বেড়ানো সাধারণ, দরিদ্র, ক্লিষ্ট, নামগোত্রহীন মানুষের মধ্যে, আমাদের সব্বার মধ্যে। সেই সব মানুষরূপী ঈশ্বরের কথা বলতে গিয়ে সন্ন্যাসীর চোখ দিয়ে জল পড়তো, তাঁর কণ্ঠ রুদ্ধ হয়ে আসতো যখন দূরের যে পরাধীন দেশ থেকে তিনি এসেছেন, সে দেশের ইতিহাসের কথা, মায়েদের কথা, মেয়েদের কথা, গভীর সব স্বপ্নের কথা বলতেন। এক নিঃশ্বাসে আলোচনা করে যেতেন সামাজিক ইতিহাস, আবার পরক্ষণেই প্রবল দার্শনিক সব তত্ত্বে ডুব দিতেন।
কিছুদিনের মধ্যেই মার্গারেটের মনে সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হয়ে দাঁড়ালো – ইনি আসলে কে? কী চান? কী লক্ষ্য এঁর জীবনে? যত কথা শোনেন সন্ন্যাসীর, তত উত্তর গুলিয়ে যায়। শেষে থাকতে না পেরে, মার্গারেট একটি চিঠি লিখে ফেলেন সেই স্বামী বিবেকানন্দকে; চিঠিটির গোদা বাংলায় মর্মার্থ হল – "আপনার উদ্দেশ্যটা কী বলুন তো! কী করতে চাইছেন আপনি?"
১৮৯৫ সালের ৭ই জুন মার্গারেটের কাছে এসে পৌঁছয় সেই চিঠির উত্তর। এই পোস্টের সঙ্গে ছবিতে সেই উত্তরটি দেওয়া রইল। কয়েকটি ভাগে ভাগ করে পড়া যেতে পারে চিঠিটি –
১। শুরুতেই স্পষ্ট, কাটা কাটা ভাষায়, আবেগের বা ধোঁয়াশার বিন্দুমাত্র অবকাশ না রেখে স্বামী বিবেকানন্দ উত্তর দিয়েছিলেন মার্গারেট নোবেলকে – তাঁর উদ্দেশ্য, মানুষের কাছে পুনর্বার মানুষের অভ্যন্তরস্থ দেবত্বের প্রচার করা, এবং সেই দেবত্বকে জীবনের প্রতিটি কাজে অভিব্যক্ত করা।
মার্গারেটের কাছে সেইদিন এক জোরালো ধাক্কায় খুলে গিয়েছিল এক নতুন জগৎ। দেবতার খোঁজে, ঈশ্বরের পরিচয় খুঁজতে মানুষ কত না ছুটে বেড়ায়, কত কষ্টকল্পনা দিয়ে গড়ে তোলে অসহায়ের মতো তার ঈশ্বরকে। এই প্রথম একজন মানুষ মার্গারেটকে যেন ঝাঁকিয়ে দিয়ে বললেন – দেবতা মানুষ নিজেই; দেবত্ব প্রতিটি মানুষের অন্তরে সদা-অধিষ্ঠিত। কিন্তু নানা আবরণে সে ঢাকা পড়ে আছে, আমরা চিনতে পারি না নিজেদের প্রকৃত সেই দেবত্বকে। তাই, আপামর মানবজাতির কাছে তাঁর নিজেরই দেবত্বের অবিরাম প্রচার প্রয়োজন। মানুষ যদি সচেতন হয়ে ওঠে তার অন্তর্নিহিত দেবত্ব সম্বন্ধে, জীবনের ক্ষুদ্র থেকে ক্ষুদ্রতর কাজও সেই বোধে বলীয়ান হয়ে উঠবে। বদলে যাবে আমাদের সমাজ।
২। চিঠিতে বিবেকানন্দ ধিক্কার জানিয়েছিলেন কুসংস্কারকে – যে কুসংস্কার দ্বারা সমাজের অর্থবান, ক্ষমতাবান শ্রেণী হীনবল মানুষদের উপর আধিপত্য কায়েম করে, শোষণ করে চলেছে, যথেচ্ছ অনাচার করে চলেছে। এই প্রসঙ্গেই বিবেকানন্দ একটি সাঙ্ঘাতিক কথা বললেন – অত্যাচারিত যারা, তাদের প্রতি তাঁর করুণাদৃষ্টি সদা বর্তমান, কিন্তু তারও চেয়ে বেশি করুণার পাত্র যারা অত্যাচারী, তারা।
প্রথম বিশ্বযুদ্ধ যখন পৃথিবীতে হত্যালীলার ফ্রি লাইসেন্স হয়ে উঠেছে, যুদ্ধ নিয়ে যখন যুদ্ধবাজেরা রোম্যান্টিক হয়ে উঠছেন, ইংরেজ কবি উইলফ্রেড আওয়েন সদর্পে নিজের কাব্যগ্রন্থের মুখবন্ধে লিখছেন – যুদ্ধ নিয়ে গর্ব করার কিস্যু নেই। তাই, তাঁর কবিতা যুদ্ধকে glorify করে না; বরং যুদ্ধকে করুণা করে – "My subject is war; the pity of war."
যে ক্ষমতাশালী নিজের প্রতিষ্ঠার পথে হীনবলকে দমন করে, শোষণ করে সে নিজেই করুণার পাত্র – বিবেকানন্দের এই কথাও মার্গারেটের কাছে নতুন ছিল। চোখে আঙুল দিয়ে বিবেকানন্দ দেখিয়ে দিচ্ছিলেন বছর পঁচিশের সেই তরুণীকে – পৃথিবীর ইতিহাসে ক্ষমতাবান-প্রবর্তিত দমন আসে তার নিজেরই হীনম্মন্যতা থেকে; যে কোনও মুহূর্তে তার দম্ভ চূর্ণ হতে পারে, এই ভয়ে সে সবাইকে দমন করতে চায়। কিন্তু মানুষের ইতিহাস তো এমনভাবে লেখার কথা ছিল না। ইতিহাস তো ভালোবাসার কথাও বলতে পারতো। কিন্তু বলে না, এ কথা সেদিন বলেছিলেন বিবেকানন্দ। হয়তো এও বলতে চেয়েছিলেন – এখনও দেরী হয়ে যায় নি। আগামীর জন্য যেন আমরা ভালোবাসার ইতিহাস রেখে যেতে পারি।
৩। ভোগবাদী স্রোতে গা ভাসিয়ে দেওয়া পাশ্চাত্যের জমিতে দাঁড়িয়ে বিবেকানন্দ সেই চিঠিতে উচ্চারণ করছেন ত্যাগের মন্ত্র, ত্যাগের প্রয়োজনীয়তা। এই পৃথিবী, মানুষের এত গর্বের সভ্যতা কঙ্কালসার হয়ে ধুঁকছে। কিন্তু কে দেবে আলো? কে দেবে প্রাণ? অনিঃশেষ প্রেম ও করুণার আধার হয়ে আজ প্রয়োজন প্রতিটি মানুষের এক একজন বুদ্ধ হয়ে ওঠার; তবে যদি পার্থিব কলঙ্কের ভার একটু কমে! এই বুদ্ধেরা কেমন হবেন? ত্যাগী – "The earth's bravest and best will have to sacrifice themselves for the good of many, for the welfare of all."
এই কথাগুলি যে মানব-ইতিহাসে এর আগে উচ্চারিত হয়নি, এমন নয়। কিন্তু বিবেকানন্দের কথার প্রতিটি শব্দের এই দৃঢ়তা, এই নিশ্চয়তা হয়তো অভূতপূর্ব। মানুষ ভেবে অভ্যস্ত – আগে নিজেকে গুছিয়ে নিই, তবে তো বাকি বিশ্ব! কিন্তু শেষে দেখা যায়, নিজেকে গোছানোর এই কাজ আমাদের আর ফুরোয় না। তাই, এক নিমেষে নিজেকে 'গোছানোর' সেই সমস্ত দিবাস্বপ্নে আগুন জ্বালিয়ে দিচ্ছেন বিবেকানন্দ – সমাজের মঙ্গল হবে একমাত্র তাঁদের হাতে, যাঁরা মানুষকে ভালো রাখতে ঝাঁপ দেওয়ার আগে একবারও নিজের কথা ভেবে ইতস্ততঃ করবেন না।
৪। চিঠির শেষাংশেও বোমাবর্ষণ। দ্বর্থ্যহীন ভাষায় বিবেকানন্দ বলছেন – তথাকথিত প্রাতিষ্ঠানিক যে সব ধর্মসকল মানুষের সেবা করার কথা বলে, মানুষকে 'পরিত্রাণ' করার কথা বলে, তারা আজ নিতান্তই ভাঁড়ামিতে পরিণত হয়েছে। সেই সব ধর্ম আচার-উপাচারে জর্জরিত, শুচিবাইগ্রস্ত, জাতের অস্পৃশ্যতা বিচারে তাদের দিন যায়, মানুষকে ঠকিয়ে তারা আখের গোছায়।
তাই, এই সকল আচার-উপাচার ভেঙে স্বামীজী তুলে ধরছেন বিকল্প পথ – আজ নতুন আর কোনও ধর্মের প্রয়োজন নেই; প্রয়োজন চরিত্রের, চরিত্রবান মানুষের। যে মানুষ আদর্শ দিয়ে গড়ে তুলবে নিজের শরীরের প্রতিটি স্নায়ু, যে মানুষ এই পৃথিবীর বুকে দাঁড়িয়ে পৃথিবীর কাছে মাথা নত করবে কৃতজ্ঞতায়, বুক চিতিয়ে ভালোবাসবে সকলকে – কারণ, ভালোবাসা তার ধর্ম, যে মানুষ মৃত্যুকে তুচ্ছজ্ঞান করবে আদর্শের সামনে – এমন মানুষ চেয়েছিলেন বিবেকানন্দ সেদিনের চিঠিতে।
সেই চিঠি-পড়া তরুণীই পরবর্তীকালে হয়ে ওঠেন ভগিনী নিবেদিতা – বিবেকানন্দের ঘনিষ্ঠতম শিষ্যা। গুরুর পদাঙ্ক অনুসরণ করে ভারতে এসেছিলেন সেই অসমসাহসী নারী, নিজেকে উজাড় করে দিয়েছিলেন আমাদের এই দেশের মানুষের পায়ে – এমন আত্মাহুতি বিরল। নিবেদিতার সমাধিফলকে তাই লেখা – "Who gave her all to India". সমাধিফলকের ওই 'ALL' শব্দটির ব্যাপ্তি যে কত বড়, সে আমাদের ধারণার বাইরে।
সবকিছুই শুরু হয়েছিল উপরের ওই চিঠিটি থেকে। আজ, এত বছর পর – চিঠিটিতে লেখা কথাগুলির গুরুত্ব কি কিছুমাত্র কমেছে? কী মনে হয়?
Comments
Post a Comment