ঊষারঙের সাঁকো

মানবসভ্যতার ইতিহাস ঘুরে চলেছে মন্দে-ভালোয়। একদিকে হঠকারিতা, উন্মার্গগামিতা; অন্যদিকে আদর্শ ও আপসহীন মূল্যবোধের প্রকাশ। একটি যদি অন্ধকার হয়, অন্যটি আলো; একটি পশ্চিম হলে অন্যটি পূব। এবং রুডিয়ার্ড কিপলিংয়ের ভাষায় – 'never the twain shall meet'; এই দুয়ের মিলন অসম্ভব। 

কিন্তু একদমই কি অসম্ভব? 

নির্লজ্জ দুষ্কর্মের সবটাই কেবলমাত্র রোয়াব নেওয়ার ইতিহাস নয়। এক-আধটা গল্প প্রতিদিনই সেখান থেকে ছিটকে আসে, যার গায়ে লেগে থাকে অনুতাপের অমৃত। তেমনই, আপসহীন মূল্যবোধেরও একেবারে অনমনীয় হলে চলে না। তাই, সেই তালিকায় বসত করে ক্ষমাশীলতা। 

অনুতাপ আর ক্ষমাশীলতা – দুয়ে মিলে খারাপ আর ভালোর মাঝে তৈরি করে এক ঊষারঙের সাঁকো – যে পথ ধরে রাত পেরিয়ে ভোর হয়। 

সেই সাঁকো আমাদের বারবার বলে যায় – পেনাল কোড অনুযায়ী শাস্তি দিয়ে সাময়িক ভাবে একটি দুষ্কর্ম দমন করা যায় বটে, কিন্তু দুষ্কৃতীকে দরবেশ বানাতে পারে কেবলমাত্র অন্ধকারের অনুতাপ ও আলোর ক্ষমা।

কথামৃতে তাই ঠাকুর বলেন, মনের ময়লা চোখের জলে ধুয়ে ফেলা যায়। আইন-আদালত-খাপ এসব কিছুই লাগে না, যদি কেউ নিজের ভুল বুঝে, অনুশোচনায় কাঁদতে পারে। চোখের সেই জলে দোষ ধুয়ে যায়; যা কিছু পুণ্যবান, সে-ও যেন নিজের অহং ছেড়ে তখন জড়িয়ে ধরতে পারে অনুতপ্ত মানুষটিকে – গ্রহণে, ক্ষমায়। নইলে যে তার অনমনীয় ক্ষমাহীনতা আরও বড় পাপ হয়ে কুরে খাবে তাকে।

আমেরিকায়, ১৮৯৩ সালে 'বিশ্বজনীন ধর্ম'-এর সংজ্ঞা দিতে গিয়ে বিবেকানন্দ বলছেন – সে ধর্মকে ব্রাহ্মণ্যবাদী হতে হবে না, ইসলামীয় হতে হবে না, বৌদ্ধ-জৈন-শিখ কিছুই হতে হবে না। সেই ধর্মে কেবল যেন সাধু ও পাপী – উভয়ের জন্য স্থান থাকে। 

অনেকে এখানে ভুরু কুঁচকে ফেলেন – বিবেকানন্দ কি ঔদার্যের ইউটোপিয়া সৃষ্টি করতে গিয়ে শেষকালে পাপকেও প্রশ্রয় দেওয়ার কথা বলছেন বিশ্বজনীন ধর্মে? 

না, পাপকে প্রশ্রয় দেওয়া নয়। বিবেকানন্দ তাঁর গুরুর দেখানো পথেই চলছিলেন – প্রাতিষ্ঠানিক ধর্মের বজ্রকঠোর নিয়মনীতি দিয়ে সাধু ও শয়তানকে দাগিয়ে দেওয়ার দমবন্ধ করা পরিসর থেকে বেরিয়ে অনুতাপ ও পরিত্রাণের সম্ভাবনা রেখেছিলেন সেই সংজ্ঞায় তিনি।

হতেও তো পারে, একটি খুব খারাপ মানুষ একদিন নিজের ভুল বুঝল। কতরকম কষ্ট সে এই পৃথিবীতে দিয়েছে, সে কথা ভেবে তার চোখে জল এল। যেন সে তখন দু-দণ্ড কাঁদতে পারে। ভালোর পথে সে আসতে চাইলে, তখন তাকে লক্ষ্মীছাড়া করার মতো পাষাণহৃদয়, অশুভ এই পৃথিবী যেন না হয়ে ওঠে কোনোদিন। 

অনুতাপ হাত বাড়াবে, ক্ষমা এসে সেই হাত ধরবে। তবে না বলব, 'এমনই বহে ধারা'।

Comments