পূর্ব-পশ্চিম
শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, পূব দিকে হাঁটতে শুরু করলে পশ্চিম আপনিই দূরে সরে যায়।
কত সহজ, সরল, প্রায় চোখে-না-পড়া কথা। কিন্তু কী বিরাট জীবনদর্শন তার পিছনে!
আমাদের জীবনে দশটি সাফল্য এলে, একশটি ব্যর্থতা আসে। এই দেখছি সাফল্যের, সুখের তরঙ্গ; পরক্ষণেই ব্যর্থতা, শোকের বিরাট ঢেউ। সে ঢেউ এলে সব ছন্নছাড়া হয়ে যায়। যেমনভাবে সাজিয়েছিলাম আমার পথটা এতদিন, নিমেষে সেই পথ ভঙ্গুর। চলার পথটি এতদিন ছিল আলোয় মোড়া, ভাবিও নি অন্ধকার আসতে পারে। এখন, সমস্ত আলো নিভেছে। অন্ধকারে চোখ আর সইছে না। সদ্য পেরিয়ে আসা সুখস্মৃতিগুলিকে মনে হচ্ছে গতজন্মের জলছবি। মনের জোর তলানিতে গিয়ে ঠেকেছে, আশা-ভরসা পাচ্ছি না কোথাওই। জবুথবু, অথর্বের মতো অপেক্ষা করছি এই সময় কেটে যাওয়ার।
অতঃকিম্? আমাদের সেই অপেক্ষা দীর্ঘ হয়, দীর্ঘতর হয়, তবু সুদিন আর এসে ধরা দেয় না। আমরা নিজেরাও জানি না, কে এসে আমাদের আলো দেবে, প্রাণ দেবে, তবু আমরা অপেক্ষা করতে থাকি, কল্পনা করতে থাকি এক পরিত্রাতার মুখচ্ছবির।
এই অবস্থায় শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, পূব দিকে হাঁটতে শুরু করলে পশ্চিম আপনিই দূরে সরে যায়।
পূর্ব – সূর্যোদয়ের দিক, আশার দিক; পশ্চিম – সূর্যাস্তের দিক, আঁধার-পটিয়সী। আমরা সাধারণ বুদ্ধিতে আলোকে আনন্দ বা আশার সঙ্গে, এবং অন্ধকারকে দুঃখ বা হতাশার সঙ্গে মিলিয়ে থাকি বলে শ্রীরামকৃষ্ণ বেছে নিলেন এই উদাহরণ। চাই বা না চাই, কর্মের ফেরে বা ভাগ্যের ফেরে আমরা জীবনে বারবারই এসে পড়ি পশ্চিমে, হতাশায়, অন্ধকারে।
এখন, আসল কথাটি হলো – আলো ফিরে পাওয়ার জন্য পশ্চিমকে দূরে পাঠাতে হবে। কিন্তু বেচারা পশ্চিম চলচ্ছক্তিহীন, সে হেঁটে চলে আমার থেকে দূরে যেতে পারে না। তাই পশ্চিম থেকে দূরে যাওয়ার কাজটি আমাকেই শুরু করতে হবে।
যুক্তি দিয়ে উপরের এই কথাটি বুঝে নেওয়া কত সহজ, অথচ বাস্তবজীবনে এই উপদেশ মেনে চলার মতো দুরূহ কাজ বোধ হয় দুটি নেই! অন্ধকার আমাকে গ্রাস করলে, তা থেকে বেরিয়ে আলোর পথে আসার সম্ভাবনার অনেকটাই, বা নিদেনপক্ষে শুরুর পদক্ষেপটুকু নির্ভর করে থাকে আমার ইচ্ছাশক্তির উপর, দৃঢ় সংকল্পের উপর।
তাই, অন্ধকার এসে পড়লে তাকে সরানোর এক এবং একমাত্র উপায় – মনের জোরে এগিয়ে যাওয়া, আলোর দিকে। আলোর অপেক্ষা নয়, একমাত্র আলোই পারে অন্ধকারকে মুছে দিতে। সেই আলো যদি সহজে না আসে, অন্ধকারের মধ্য দিয়েই এগোতে হবে। হোঁচট খাবো, মুখ থুবড়ে পড়বো, কেটে ছড়ে যাবে হাত-পা; এবং এই আঘাতগুলি হবে আমার পথের সঞ্চয়। আঘাত সয়ে গেলে দেখবো, অন্ধকার আর আমায় ভয় দেখাতে পারছে না; হতাশা আমায় মারতে পারছে না। তাদের সমস্ত দাঁতনখ উপেক্ষা করে আমি অবিচল চলেছি আলোর দিকে। পূবের দিকে যত এগোচ্ছি, পশ্চিম ততই দূরে সরে যাচ্ছে।
গীতাঞ্জলির গানে রবীন্দ্রনাথ বলছেন –
"ডাকিছে মেঘ, হাঁকিছে হাওয়া
সময় গেলে হবে না যাওয়া"
প্রবল দুর্যোগ চারিদিকে – মেঘ ডাকছে, ঝড় বইছে গর্জন করে। এর মধ্যে ভীত, সন্ত্রস্ত হয়ে আমি যদি ঘরে দরজা বন্ধ করে বসে থাকি, 'কেউ ঝড় থামিয়ে দিক', 'মেঘেরা শান্ত হোক', 'রোদ উঠুক' এসব ভেবে, তাহলে মিছেই সময় বয়ে যাবে কেবল। ঝড়ও থামবে না, রোদও উঠবে না। আমারও আর সুসময়ে যাওয়া হবে না। তাই, যে ঝড়ের তোয়াক্কা না করে বেরিয়ে পড়েছে রোদের খোঁজে, যে ঘোর অন্ধকারেও আলোর খোঁজ করা থেকে বিরত থাকে নি, যে পশ্চিম থেকে পূবের পথে রওনা দিয়েছে, সে-ই ঠিক ঠিক ধর্ম পালন করছে। পশ্চিম যথার্থই দূরে সরছে তার থেকে, আপনিই।
ব্যর্থ হয়ে, কার অপেক্ষায় আমরা দিন গুনছি? কী সেই 'Miracle' যা আমাদের পশ্চিম থেকে পূবে নিয়ে যাবে? We are the miracle the East is waiting for.
Comments
Post a Comment