আসল বাঘ, ছাগল বাঘ
শ্রীরামকৃষ্ণ একটি গল্প প্রায়ই বলতেন।
প্রসবকালে একটি বাঘিনী মরেছে, আর ছানাটি কীভাবে যেন গিয়ে পড়েছে ছাগলের পালে। সে তারপর থেকে তাদের সঙ্গেই থাকে, তাদের সঙ্গেই বড় হয়। তারাও ডাকে 'ভ্যা ভ্যা', সে-ও বিনা বাক্যব্যয়ে 'ভ্যা ভ্যা' করে। ক্রমেই ছানাটি বড়সড় বাঘ হয়ে উঠলো, কিন্তু আজও সে ছাগলদের সঙ্গে মাঠে চরে বেড়িয়ে ঘাস খায়।
এমন সময়, আরেকদিন এক বাঘ সেই ছাগলের পাল দেখে শিকার করতে এল। এসে দ্যাখে, ওমা, একটা ঘাসখেকো বাঘ সেখানে আগে থেকেই 'ভ্যা ভ্যা' করে ঘুরে বেড়াচ্ছে! তখন বাঘটা দৌড়ে এসে সবার আগে তাকে ধরলো। সেই ছাগল-বাঘ প্রাণভয়ে প্রবল 'ভ্যা ভ্যা' করতে লাগলো।
আসল বাঘ তখন জোর করে টেনে হিঁচড়ে ছাগল-বাঘকে নিয়ে গেল জলের কাছে। এক ধমক দিয়ে বললো, 'দ্যাখ, জলের ভিতরে তোর মুখ দেখ! ঠিক আমার মতো! দেখ!' ছাগল-বাঘ জলে উঁকি মেরে দেখলো, সত্যিই তো মুখ একদম এক! তবু তার আদ্ধেক বিশ্বাস হলো, আমতা আমতা করতে লাগলো। তখন আসল বাঘটি অন্য পশুর খানিকটা মাংস ছাগল-বাঘের মুখে ঠুসে দিয়ে বললো, 'এই নে, খা!' সে বেচারা কিছুতেই খাবে না প্রথমে – ঘাস-খাওয়া শরীর তার! আবার ধমক খেল, 'বাঘে ঘাস খায় শুনেছিস কখনও? মাংসটা খা!' অনিচ্ছে করেও খেতে গিয়ে, যেই রক্তের স্বাদ পেল, ছাগল-বাঘটা একটু একটু করে সবটা খেয়ে নিল।
আসল বাঘ বললে, 'এবার বুঝলি, আমিও যা তুইও তা! এখন চল, বনে যাবি!'
=====================
এবার বাকি কথা আর কী বলি! এতক্ষণে আমরা সবাইই নিজেদের বাঘ ভেবে ফেলেছি; ছাগলের পালেও যে আমরা মাঝেমধ্যে ভিড়ে গিয়ে না জেনে-বুঝে 'ভ্যা ভ্যা' ডেকে ফেলেছি, এও বুঝেছি। বুঝে বেশ লজ্জাও পাচ্ছি।
আর ওই 'আসল বাঘ'? সে বাইরে থেকে আসতেও পারে, নাও পারে। কিন্তু আমাদের ভিতরে সে সদাসর্বদা বসে আছে। সে আমাদের আত্মশক্তি, আত্মবিশ্বাস। আমরা ভুল পথে গেলে, আত্মবিস্মৃত হলে, সে মাঝেমাঝেই আমাদের গর্জন করে ডাক দিচ্ছে – 'ওরে, ভুলে যাস না তুই বাঘ! ছাগল সেজে কী আনন্দ পাচ্ছিস!'
যদি এখনও আমরা তার ডাকে সাড়া না দিয়ে থাকি, এর পর সে ডাকলে যেন অন্ততঃ ভুল না করি।
🙂 পারলে নিয়মিত লেখো।
ReplyDeleteচেষ্টা করি। 😊
Delete