শ্রদ্ধায় স্মরণ

রামকৃষ্ণ মঠ ও মিশনের ষোড়শ সঙ্ঘাধ্যক্ষ পূজনীয় স্বামী স্মরণানন্দের দেহাবসানে শ্রীরামকৃষ্ণ-শ্রীশ্রীমা-স্বামীজী প্রবর্তিত ভাবধারার প্রাতিষ্ঠানিক পরিচালনার আরও একটি যুগের অবসান হল। সপ্তদশ সঙ্ঘগুরু সামনের কিছুদিনেই দিব্যত্রয়ীর বকলমে হাতে তুলে নেবেন সার্বিক পরিচালনার ভার। এই সন্ধিক্ষণে ফিরে দেখা যাক স্বামী স্মরণানন্দের কিছু কথা।

মহারাজের লেখা 'Musings of a Monk' বইটিতে একটি অধ্যায় ছিল 'Students and Swami Vivekananda'; বাংলায় এটি অনুবাদ করেন সুমনা সাহা – 'ছাত্রসমাজ ও স্বামী বিবেকানন্দ' শিরোনামে। অধ্যায়ের শেষদিকে একটি অংশে মহারাজ লিখছেন – 

নিম্নলিখিত বিষয়গুলি যুবসমাজের শিক্ষার জন্য গৃহীত কর্মসূচির অন্তর্ভুক্ত করা যেতে পারে-

১। দরিদ্র ছাত্রছাত্রীদের জন্য কোচিং ক্লাসের ব্যবস্থা। ছাত্ররা নিজেরাই এই ক্লাস পরিচালনা করবে। যেমন, কলেজের ছাত্ররা স্কুলের ছাত্রদের পড়াতে পারে।

২। বয়স্ক শিক্ষাকেন্দ্র।

৩। কৃষিকাজের আধুনিক কৌশল শিক্ষা করতে সক্রিয় অংশগ্রহণ করা এবং গ্রামের মানুষকে এই কৌশলগুলি শিখিয়ে দেওয়া।

৪। বস্তি সাফাই অভিযান এবং বস্তিবাসীদের স্বাস্থ্যবিধি শিক্ষা দেওয়া।

৫। জনগণকে গণতান্ত্রিক ঐতিহ্য সম্পর্কে শিক্ষিত করে তোলা।

৬। বিপ্লবের আদর্শকে নতুন পথে, অন্তরের বিপ্লবের দিকে মোড় ফিরিয়ে দিতে হবে, যাতে জীবনের প্রতিটি ক্ষেত্রে দুর্নীতির বিরুদ্ধে লড়াই করা যায়।

৭। ছোট শিশুদের সঙ্ঘবদ্ধ করে পরিচ্ছন্নতা, গান, খেলাধুলো, সমাজ-সচেতনতার শিক্ষা দিতে হবে।

প্রতিটি কথার মধ্য দিয়ে প্রকাশিত হয় স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত সেবাযোগের আত্মাটি। 'সেবা' কথাটির অর্থ স্বামীজীর কাছে কেবল অসাম্য-ঘোচানো দানকর্মের ধারণায় সীমাবদ্ধ ছিল না। তাঁর কাছে সেবাকর্ম সেবা-আদর্শে প্রতিষ্ঠিত; সেই আদর্শ মানুষকে জাগতিক ও আধ্যাত্মিক ভাবে সমর্থ করে তোলার। 

আরও বলার, স্বামীজীর কাছে সেবা মূলত তিন প্রকারের – জাগতিক বা material, বৌদ্ধিক বা intellectual, এবং আধ্যাত্মিক বা spirirual। সাম্যের ভিন্ন ভিন্ন স্তরে ভিন্ন ভিন্ন মানুষ, ভিন্ন তাঁদের অবস্থা ও অবস্থান, ভিন্নতর ইতিহাস। প্রত্যেকের জন্য একইসঙ্গে সব প্রকারের সেবা প্রযোজ্য নয়। যে মানুষটি জাগতিক চাহিদা মেটাতে অক্ষম, তাঁর প্রাথমিক ভাবে প্রয়োজন জাগতিক সেবা। সেই চাহিদা মেটাতে সে সমর্থ হলে, তবে বৌদ্ধিক সেবা, ও সবশেষে উচ্চতম আধ্যাত্মিক সেবা লাভ করার উপযোগী হয়ে উঠবে সে। 

স্বামী স্মরণানন্দের উপরের কথাগুলিও স্বামী বিবেকানন্দ প্রবর্তিত সমর্থ করার সেবায় বিশ্বাসী। ১, ২ ও ৩ নং কথাগুলি বৌদ্ধিক সেবা সম্বন্ধীয়। ১ নং কথায় শিক্ষাক্ষেত্রে 'Peer engagement'-এর গুরুত্বপূর্ণ দিক উঠে আসে; অর্থাৎ উঁচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীরা নিচু ক্লাসের ছাত্রছাত্রীদের পড়াবে – একদলের শেখা হবে, অন্য দলের শিক্ষাসেবক হওয়ার হাতেখড়ি হবে। ২ নং কথাটি আরও বেশি করে মানবিক এই কারণেই যে – যে সব মানুষেরা শৈশবে বা তারুণ্যে সেভাবে শিক্ষালাভ করতে পারেন নি নানা কারণে, বার্ধক্যে যাঁদের জন্য প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষায় বড় একটা জায়গা নেই, তাঁদের শিক্ষার সুযোগ দিতে পারে ছাত্রছাত্রীদের শিক্ষা-বিষয়ক কর্মসূচি। শৈশবে শিক্ষার অভাব বয়স্করা পূরণ করে নিতে পারেন এখনও। ৩ নং কথাটি কেবল পুঁথিগত বিদ্যা নয়, প্রায়োগিক দিকটির উপর জোর দেয় – যা অনেক বেশি করে জীবিকা-কেন্দ্রিক। সমাজে মানুষকে স্বনির্ভর করে তোলার অন্যতম অস্ত্র এটি।

৪ নং কথাটি জাগতিক স্বাস্থ্য-সম্বন্ধীয় সেবার কথা বলে। বস্তি সাফাইয়ের মাধ্যমে হাতেকলমে কাজটি করে দেখানোও হয়, আর পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যবিধি নিয়ে প্রচারের মাধ্যমে আগামীদিনের জন্য বস্তিবাসীকে এইসব কাজ নিয়মিত ভাবে করার প্রয়োজনীয়তা সম্বন্ধে সচেতন করা যায়। 

৫ নং কথাটিও সচেতনতা-ধর্মী। সমাজে মাথা উঁচু করে, নিজ-অধিকারে ও অন্যের অধিকার খর্ব না করে বাঁচার জন্য সাংবিধানিক সচেতনতা আবশ্যক। প্রাণশক্তিতে পরিপূর্ণ, সঠিক পথে জীবনযাপন করতে উদ্যত ছাত্রসমাজ পারে সাংবিধানিক এই সচেতনতার প্রসার ঘটাতে ভারতের মতো দেশে। এই সেবা গণতন্ত্রের মেরুদন্ড পোক্ত করে আরও।

৬ নং কথাটি নিরঙ্কুশ ভাবে আধ্যাত্মিক। আমাদের সামাজিক প্রায় সব বিপ্লবই বহির্মুখী। স্বচক্ষে প্রত্যক্ষ করা বা অনুভব করা মানুষের কোনও কোনও কষ্ট বা অসাম্যের ভিত্তিতে এই বিপ্লব গড়ে ওঠে। কিন্তু বৃহত্তর ইতিহাসের নিরিখে বহির্মুখী বিপ্লব নিতান্তই ক্ষণিকের একটি ঢেউ। সে আশু সমস্যার সমাধান অনেক সময়ই করে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি ভাবে মানুষের অবস্থান্তর ঘটাতে সফল হয় না। অসাম্য অশ্বত্থ গাছের ফেকড়ির মতো আর কোনও দিক দিয়ে গজিয়ে ওঠে। এই অবস্থা দূরীকরণের জন্য একমাত্র উপায় বিপ্লবকে অন্তর্মুখী করা। নিজ দায়িত্বে বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা যদি নিজেদের জীবনীশক্তির গতিপথটির মোড় ঘুরিয়ে দিয়ে, উচ্চতর আদর্শ ও মূল্যবোধে গড়ে তোলে নিজ-জীবন এবং সেই দ্যুতি ছড়িয়ে দেয় দিকে দিকে, তবে হাজার কঠিন পরিস্থিতিতেও দুর্নীতির ফাঁদে সে আর পা দেবে না। সমাজে সাম্য রাখতে কোনও দেশনায়কের অঙ্গুলিহেলন প্রয়োজন হবে না; ব্যষ্টির স্বশাসনেই সমাজ পূর্ণতা লাভ করবে।

৭ নং কথাটি মহারাজ বলেছেন আগামীদিনের ভারতকে উদ্দেশ্য করে। আজ যারা ছোট, কাল তারাই গড়ে তুলবে নতুন ভারত; অন্তত সেরকমই আমাদের আশা। কিন্তু সেই ভারতগঠনের মূলধন তাদেরকে দিয়ে যাব আমরাই – অর্থাৎ বর্তমান ছাত্রছাত্রীরা। ছোটদের কেবল বইয়ের শিক্ষা দেওয়া নয়, তাদের সঙ্ঘবদ্ধ করে একসঙ্গে বাঁচার (community life) শিক্ষা দেওয়া, পরিচ্ছন্নতা, গান (বৃহত্তর অর্থে শিল্পসংস্কৃতি) ও সমাজসচেতনতার শিক্ষা দেওয়া তাদের সামগ্রিক বিকাশের সহায়ক হবে। দায়িত্ববান, সচেতন এক একজন ভারতীয়ই নয় কেবল, বিশ্বনাগরিক হয়ে উঠবে তাঁরা।

স্বামীজীর Man-Making Mission (মানুষ গড়ার ব্রত)-এর খুব সুগঠিত একটি ধারণা পাওয়া যায় স্বামী স্মরণানন্দ মহারাজের এই সংক্ষিপ্ত রচনাংশ থেকে। শক্তিদায়ী, গঠনমূলক এই ভাবধারাকে আধুনিক সময়ের উপযোগী করে তোলার যে পথনির্দেশ করেছিলেন বর্তমান অধ্যক্ষ মহারাজ, তা স্মরণ করে আমরা তাঁর প্রতি শ্রদ্ধাঞ্জলি নিবেদন করি। 

Comments