বড়বাবুর দর্শন

আসল কাজটা সারতে গিয়ে আমরা তার আগুপিছু নানা খবরে জড়িয়ে পড়ি। ভাঙা ভাঙা কত গুজব কানে আসে, তাকেই সত্যি মনে হয়। সে নিয়ে আর পাঁচজনের সঙ্গে আলোচনা করি, গুজবের সন্তানাদি হয় সে থেকে। সেই 'আসল কাজ'-টি ক্রমশই ধোঁয়াশায় ঢেকে যেতে থাকে। তাকে আর আমাদের পাওয়া হয় না।

ঠাকুর বলছেন, বড়বাবুর সঙ্গে আলাপ দরকার তাই সব্বার আগে। বড়বাবুর দালানে যেতে যেতে অনেক কিছু চোখে পড়বে, অনেক কথা কানে আসবে। না জানি কটা বাড়ি বাবুর! কটা বাগান! কতগুলো কোম্পানি! সে-সব নিয়ে খোঁজ নিতে যাও প্রহরী-ভৃত্যের কাছে, খেদিয়ে দেবে। না হবে বাবুকে জানা, না হবে তার সম্পত্তির হিসেব পাওয়া।

তাই যো-সো করে বড়বাবুর সঙ্গে একবার আলাপ কর, ধাক্কা খেয়েই হোক, আর বেড়া ডিঙ্গিয়েই হোক। একটিবার খুঁটি যদি ওইখানে বাঁধা হয়ে যায়, বাড়ি আর বাগানের হিসেব বড়বাবু নিজেই তোমায় দেবেন, পাশে বসিয়ে। প্রহরী এসে তোমায় সালাম দেবে, বড়বাবুর খাস মেহমান বলে কথা!
ঠাকুর এসব বলছেন আধ্যাত্মিক সাধনপথের প্রসঙ্গে। ঈশ্বর সাকার না নিরাকার, রাম না আল্লাহ, খ্রিষ্ট না শিব, তিনি ত্রিনয়ন না চতুর্ভুজ, এসব নিয়েই কি জীবন কাটবে? তাঁকে সত্যিই যদি ভালোবাসো, জানতে চাও, একটা কোনও পথ ধরে এগোও না বাপু! নিজের মধ্যে তাঁকে অনুভব করো না! সেইটা একবার হলে দেখবে, তিনি কে, কী, কোথায় নিবাস, সব স্পষ্ট হয়ে যাবে নিজের ভিতরে। 

রোজকার জীবনেও, আমাদের প্রতিটা গন্তব্যের একটা পথ আছে। সেই পথের ডানদিকে বাঁ দিকে অনেক শোনা-কথার অলিগলি রহস্যময়তার হাতছানি দিয়ে আমাদের ডাকছে। তাতে ঢুকলে আরও গলি। আরও দ্বিধা! দ্বন্দ্ব! কোনদিকটা দিয়ে এবার যাব? 

আমাদেরই সিদ্ধান্ত নিতে হবে – আমরা কোনদিকে যাব! শোনা-কথায় ভরসা করে ভুলভুলাইয়ায় ঘুরে বেড়াব আর বলব 'মনে হয় গন্তব্যটা এরকম'? নাকি যে পথ নিজে দেখেছি, সময় লাগলেও সেই পথে ভরসা রেখে এগিয়ে গিয়ে গন্তব্যে পৌঁছে, তারপর বলব 'আমি জানি গন্তব্য কেমন। কারণ আমি নিজে সেখানে পৌঁছেছি'?

সিদ্ধান্ত আমাদের। 

Comments