স্বামীজীর সেবা

আলমোড়া থেকে ১১ জুলাই, ১৮৯৭ তারিখে স্বামী শুদ্ধানন্দকে লেখা স্বামী বিবেকানন্দের একটি চিঠির অংশবিশেষে তাঁর 'সেবা'র দর্শনটি সবার কাছে স্পষ্ট হয়ে ওঠে।

আজকের দিনে 'সেবা' কথাটি অনেক ক্ষেত্রে বড় সীমিত পরিসরে, সংকীর্ণ অর্থে ব্যবহৃত হয় – জনসাধারণের কাছে 'কিছু সামগ্রী দান করা', বা 'অনুদান দেওয়া', এগুলিই সেবার অংশ। স্বাস্থ্য-পরিষেবায় 'সেবা' কথাটির ব্যবহার তবু এখনও টিঁকে আছে, যদিও বহু ক্ষেত্রে নানা স্বাস্থ্যকেন্দ্রে রোগীদের সঙ্গে অমানবিক ও যান্ত্রিক ব্যবহার বোঝাতে 'সেবা' কথাটি আজকাল বিদ্রূপাত্মক অর্থেও ব্যবহৃত হয়। 

স্বামীজীর চোখে সব সেবার বড় সেবা ছিল শিক্ষা – আত্মনির্ভরতার শিক্ষা। যদি মানুষের মধ্যে আত্মবিশ্বাস, আত্মনির্ভরতা না আসে, কেবলমাত্র ধনী শ্রেণীর মানুষের দিক থেকে দরিদ্রের দিকে দান/অনুদান হিসাবে ধনের প্রবাহ ও সুষম বন্টনের মধ্য দিয়ে মানুষের জীবন বর্তাবে না। 

মুর্শিদাবাদের মহুলা গ্রামে স্বামী অখন্ডানন্দ কয়েকজন ব্রহ্মচারীকে নিয়ে দরিদ্রদের মধ্যে চাল-বিতরণ করছেন। উত্তম কার্য! কিন্তু স্বামীজী সিঁদুরে মেঘ দেখছেন। উপরের ওই চিঠিতে শুদ্ধানন্দকে লিখছেন, অখন্ডানন্দ "অদ্ভুত কর্ম করছে বটে, কিন্তু কার্য-প্রণালী ভাল বলে বোধ হচ্ছে না।"
কেন? 
"এই চাল দিয়ে সাহায্যের সঙ্গে সঙ্গে কোনরূপ প্রচারকার্য হচ্ছে – কই, এরূপ তো শুনতে পাচ্ছি না।"

গেরুয়াধারী সন্ন্যাসীর মুখে প্রচারকার্যের কথা শুনলেই আমাদের অনেকের ভয় হয়, 'ওই আবার ধর্মের আচার-বিচার, ঠাকুর-দেবতা নিয়ে কথা শুরু হবে বোধ হয়।

কিন্তু স্বামীজীর 'প্রচার'টি ঠিক কেমন, আর একটা লাইন অপেক্ষা করলেই জানা যায় –
"আমাদের কাজ হওয়া উচিত প্রধানতঃ শিক্ষাদান – চরিত্র এবং বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষসাধনের জন্য শিক্ষা-বিস্তার।"

খেয়াল করলে দেখা যাবে, স্বামীজী চাল-বিতরণের কাজটিকে ছোট করছেন না, বা বন্ধও করে দিতে বলছেন না। দরিদ্রকে অন্নদান নিঃসন্দেহে অতি বড় মাপের সেবা। কিন্তু খুব ছোট্ট একটি প্রশ্ন তুলছেন আমাদের সামনে ওই উপরের কথাগুলির মধ্য দিয়ে। প্রশ্নটি হলো – এই অন্নদানের সেবা কতদিন আমরা করে যাবো? 

'সেবা' কথাটির অর্থ ও গুরুত্বকে আমরা, বিশেষভাবে আমাদের নির্বাচিত দেশনায়ক/নায়িকারা (যাঁরা নির্বাচনের আগে বলেন, "আমরা মানুষের সেবা করতে চাই") লঘু করে ফেলেছি এতটাই, যে আমাদের বুঝতে ভুল হয়ে যায় – 'সেবা' প্রাথমিকভাবে একটি crisis situation-এ damage controlling measure। একটি কোনও বিশেষ পরিস্থিতিতে, দুই পক্ষের এক পক্ষ যখন 'হীন' বা 'Have Not', এবং অন্য পক্ষ যখন 'সমর্থ' বা 'Able', তখন সমর্থের দিক থেকে হীনের দিকে সেই বিশেষ পরিষেবার প্রবাহকে 'সেবা' বলে গণ্য করা যায়। কিন্তু এর উদ্দেশ্য কী? এর এক এবং একমাত্র উদ্দেশ্য হচ্ছে হীনকে সমর্থ করে তোলা; কারণ যে হীন, সে সমর্থ হয়ে উঠলে সে নিজে ব্রতী হবে আরও অসংখ্য হীনের মধ্যে সামর্থ্যের প্রসারে। সেবা একটি ক্রমপ্রসারী কার্য; সমর্থ যদি সামর্থ্য বন্টনের বদলে কেবলই সাহায্য বন্টন করে চলে, এবং হীন যদি চিরকাল সেই সাহায্য গ্রহণ করেই চলে, তবে বলাই বাহুল্য – সমর্থের সেই সেবা নিতান্তই ব্যর্থ। তাই 'সাহায্য করা' নয়, স্বামীজীর কাছে 'সেবা'র অর্থ সমর্থ করা

আজ যদি মানুষকে শিক্ষা না দিয়ে, তাদের কর্মসংস্থান না করে কেবল সময়ে সময়ে দান-ত্রাণ করে যাওয়া হয়, আজ যদি শিক্ষক ছাত্রছাত্রীকে নির্দিষ্ট বিষয়ের গভীরে না নিয়ে গিয়ে উপর উপর প্রাইভেট টিউশনি আর 'নোটস' দিয়ে সাহায্য করে যান, আজ যদি ডাক্তার রোগীর অসুখের শিকড়টি বাঁচিয়ে রেখে উপর উপর ডালপালা ছেঁটে দেন সময়ে সময়ে, তাহলে তা কেমন 'সেবা' হয়ে ওঠে, আমরা অনুমান করতে পারি। এমন সেবা কোনোদিন স্বাবলম্বী করে না, সমর্থ করে না, সুস্থ করে না। এইরূপ 'সেবা' চলতে থাকলে পৃথিবীর সমস্ত ওষুধ একজনের উপর উজাড় করে দিলেও সে অসুখ কমবে না; হাজারটা প্রশ্নের উত্তর ছাত্রকে দিয়ে মুখস্থ করালেও সে শিক্ষিত আর কোনোদিনই হয়ে উঠবে না।

ঠিক এই মর্মেই স্বামীজী ওই চিঠিতে শুদ্ধানন্দকে লিখছেন, "জনসাধারণকে যদি আত্মনির্ভরশীল হতে শেখান না যায়, তবে জগতের সমগ্র ঐশ্বর্য ভারতের একটা ক্ষুদ্র গ্রামের পক্ষেও পর্যাপ্ত সাহায্য হবে না।"

বিবেকানন্দের বড় গুণ এইটিই যে তিনি সমস্যার কথা বলে চুপ করে থাকতেন না। উপায় বলতেন, ভবিষ্যতের একটা ছবি এঁকে দিতেন ব্লু-প্রিন্টের জন্য। এই চিঠিতেও বলছেন – 
"এ পর্যন্ত ঐ কার্যে (চাল-বিতরণ) ফল কিছু হয়নি; কারণ তাঁরা এখনও পর্যন্ত স্থানীয় লোকেদের মধ্যে তেমন আকাঙ্ক্ষা জাগিয়ে তুলতে পারেননি, যাতে তারা দেশের লোকের শিক্ষার জন্য সভাসমিতি স্থাপন করতে পারে এবং ঐ শিক্ষার ফলে তারা আত্মনির্ভরশীল ও মিতব্যয়ী হতে পারে, ... এবং এইভাবে ভবিষ্যতে দুর্ভিক্ষের কবল থেকে নিজেদের রক্ষা করতে পারে।"

শিক্ষার বিস্তারে মানবকল্যাণ সত্যিই সম্ভব, এই কথায় বিবেকানন্দের কী অসীম আস্থা ছিল, কিছুটা অনুমান করা যায়। আজ আমাদের দেশে কোভিড-উত্তরকালে শিক্ষাব্যবস্থা ভয়াবহরূপে ক্ষতিগ্রস্থ। বিবেকানন্দ শিক্ষার দুটি স্তরের কথা বলেছিলেন এই চিঠিতে – *চরিত্রগঠন* এবং বুদ্ধিবৃত্তির উৎকর্ষসাধন। এই দুয়েরই সবচেয়ে বড় সহায়ক যে বুনিয়াদি ও তৎপরবর্তী স্কুলশিক্ষার ধাপগুলি, তারা আজ প্রশাসনিক অবহেলায়, উদাসীনতায় ধুঁকছে। কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়ের অবস্থাও তথৈবচ। বুদ্ধিবৃত্তির বিকাশ যদিও বা কিছু পরিসরে এখনও প্রতীয়মান, সঠিক পথে চরিত্রগঠনের অভাবে সেই মেধাবী ছাত্রছাত্রীরাও শেষে হৃদয়হীন যান্ত্রিকতার কলকব্জা হয়ে উঠছে।

এমন অবস্থায় আমরা যে মানুষ যে বিষয়ে পারঙ্গম, যদি সহজবোধ্য ভাষায় তার কথা ছড়িয়ে দিতে থাকি জনসাধারণের কাছে, জনপ্রিয় প্ল্যাটফর্মগুলিতে, এখনও উপায় আছে। স্কুল-কলেজের মুষ্টিমেয় শিক্ষাসেবকদের অবদান সরিয়ে রাখলে প্রাতিষ্ঠানিক উপায়ে চরিত্রগঠনের শিক্ষাদান আজ  একপ্রকার বন্ধ হয়ে গেছে। এমন অবস্থায় আমরা যদি নিজেরা একটু উদ্যোগী হই অন্তত একজন মানুষের মধ্যে এই বিশ্বাস আনতে যে তার মধ্যেও অনন্ত শক্তি ও সাহস আছে, যদি একবেলার জন্যও একটি মানুষকে তার অন্তর্নিহিত মনুষ্যত্বের ঝাঁকিদর্শন করাতে পারি, তার মুখে আশা-ভরসার হাসিটুকু ফুটিয়ে তুলতে পারি, আমাদের সামান্য সম্বলে সে কাজটিও অতি বড় সেবা হয়ে উঠবে।

Then, and then only we can claim ourselves to be the true heirs of Vivekananda, and not before that. তাঁর কাছে হাত জোড় করেও হবে না, তাঁর পায়ে ফুলমালা দিয়েও হবে না। ভালোবাসা-ই তাঁর নৈবেদ্য, সেবা-ই তাঁর অর্ঘ্য।

Comments