স্ব-বিরোধিতা
শ্রীরামকৃষ্ণ ও স্বামী বিবেকানন্দের নানা আলোচনা-উপদেশের সঙ্গে সখ্য সবেমাত্র আরম্ভ হয়েছে যাঁদের, বইগুলি পড়তে পড়তে প্রায়শই একটি প্রশ্ন তাঁদের মনে জাগে – ঠাকুর ও স্বামীজী, উভয়ের কথার মধ্যেই সময়ে সময়ে কি বিস্তর স্ববিরোধ (self-contradiction) নেই? আজ যা পড়ছি, দিন দুয়েক পরেই দেখছি অন্যত্র এমন একটি কথা ঠাকুর বা স্বামীজী বলেছেন, যা আগের কথাটির সঙ্গে মোটেই এক সুরে বাজছে না আমার মনে।
এমতাবস্থায় বলে রাখা ভালো, আমরা যাঁরা ঠাকুর বা স্বামীজীকে গভীরে গিয়ে বোঝার চেষ্টা করছি, এই আপাত-স্ববিরোধিতার উত্তর খুঁজতে গেলে কিন্তু কেবলমাত্র তাঁদের দুজনের কথাতেই থেমে গেলে চলবে না। একদম খুঁটিয়ে জানতে হবে সেই সময়টাকে, সমাজটাকে – যার বুকে দাঁড়িয়ে এই দুই যোগী কথা বলেছেন আমাদের সঙ্গে, আমাদের উদ্দেশ্যে।
শুরুতেই, মনে করে নেওয়া যায় ঠাকুরের প্রবাদপ্রতিম উচ্চারণ – 'যত মত, তত পথ', বা উপনিষদ থেকে তুলে আনা স্বামীজীর বাণী – 'একম সদ্বিপ্রা বহুধা বদন্তি'। দুয়েরই অর্থ এক – সত্য একটিই, নানা মুনি তাঁকে নানা নামে ডাকে, নানা পথে খুঁজে পায়। পাঠক হিসাবে আমাদের মনে রাখতে হবে, ঠাকুর ও স্বামীজীর প্রতিটি উপদেশ বা আলোচনা এই অভিন্নতার জমির উপর ভিন্ন ভিন্ন সুরে গড়ে তোলা। এটুকু বুঝে গেলে, স্ববিরোধিতাকেও বৈচিত্র্য মনে হতে বাধ্য।
আরও স্পষ্ট করে বোঝার জন্য বলি, ঠাকুর ও স্বামীজীর কথা পড়তে পড়তে ক্রমশ স্পষ্ট হয়, তাঁরা তিনটি মূল কথা সবসময় খেয়াল রাখতেন উপদেশ দেওয়ার সময় –
১. অধিকার
২. আধার
৩. পরিস্থিতি
ব্যাপারটা কেমন, একটু দেখা যাক।
ধরা যাক, ঠাকুরের কাছে যত মানুষ আসতেন, তাঁরা সবাইই মোটামুটি দুই প্রকার অধিকারে বিভক্ত – কেউ সংসারধর্মের অধিকারী, কেউ বা সন্ন্যাসধর্মের অধিকারী। শ্রীরামকৃষ্ণের জীবন ও বাণীর উপর প্রামাণ্য দুটি বই 'কথামৃত' ও 'লীলাপ্রসঙ্গ' লিখছেন যথাক্রমে শ্রীম (সংসারী/গৃহীদের প্রতিনিধিস্বরূপ) এবং স্বামী সারদানন্দ (ঠাকুরের সন্ন্যাসী সন্তানদের প্রতিনিধিস্বরূপ)। বইদুটিতেই সময়বিশেষে উল্লিখিত হচ্ছে – তরুণ, সন্ন্যাসী-হতে-চলা ছেলেদের জীবনচর্যা নিয়ে উপদেশ দেওয়ার কাজটি ঠাকুর সচরাচর গৃহীভক্তদের সামনে করতেন না। এমনও উল্লেখ পাওয়া যায় – রাখাল, নরেন, শরৎ, প্রমুখের সঙ্গে গভীর আলোচনার আগে ঠাকুর ঘরের বাইরে গিয়ে দেখে আসছেন কোনও গৃহীভক্ত আশেপাশে নেই তো? আবার ওই একইভাবে, গৃহীভক্তদের যখন উপদেশ দিচ্ছেন, বেশিরভাগ সময়ই সামনে রাখছেন না সন্ন্যাস-অভিমুখী তরুণদের।
এই 'ভেদাভেদ' কেন? আমরা মনে করতে পারি, শ্রীরামকৃষ্ণ উপদেশ দেওয়ার মুহূর্তে সর্বোপরি যে কথাটিকে গুরুত্ব দিতেন তা হলো – 'কারো ভাব নষ্ট করা যাবে না'। সংসারী ও সন্ন্যাসী নির্বিশেষে, মানুষের চরম লক্ষ্য এক – সেই পরম সত্যের উপলব্ধি। কিন্তু ওই সত্যে তাঁদের যাওয়ার পথটি ভিন্ন। যাঁকে পেতে সন্ন্যাসীরা অন্তরে-বাহিরে ত্যাগী হয়ে সংসার ছাড়ছেন, তাঁকেই পেতে সংসারীরা সংসারধর্ম পালন করছেন নিষ্কামভাবে। সন্ন্যাসের আদর্শের উপর প্রতিষ্ঠিত সন্ন্যাসধর্ম, সংসারের আদর্শের উপর সংসারধর্ম। ঠাকুর ভুলেও, একটিবারের জন্যও, এক ভাবের কথা অন্য ভাবের উপর চাপাবেন না। তাই, সংসারীদের কাছে তাঁর অবারিত দ্বার ছুটির দিনগুলোয়; সারা সপ্তাহের আপিস-কাছারি সেরে তাঁরা আসছেন রামকৃষ্ণ-ভাবে অভিস্নাত হতে। সেইসব সভায় তরুণ, ত্যাগী শিষ্যদের আনাগোনা থাকলেও, বিশেষভাবে উল্লেখ নেই। তাঁদের জন্য ঠাকুর রেখে দিচ্ছেন রাতটি। সংসারীরা বাড়ি ফিরে যাওয়ার পর রাতের পর রাত এইসব তরুণেরা থেকে যাচ্ছেন ঠাকুরের সঙ্গে তাঁর ঘরে, নিরলস সাধনায় তাঁদের প্রবৃত্ত করছেন শ্রীরামকৃষ্ণ, উপদেশ দিচ্ছেন সেই মাফিক। ফলত, একই উদ্দেশ্যে বলা কথায় অধিকারীভেদে জোর পড়ছে ভিন্ন ভিন্ন স্থানে; তাই আমাদের চোখে স্ববিরোধিতার একটি আলগা পর্দা তৈরি হচ্ছে।
আবার এও খেয়াল রাখতে হবে, শুধু অধিকারী ভেদেই যে সব সমস্যা মিটে যাচ্ছে, এমন নয়। সব সংসারীকে ঠাকুর এক কথা বলছেন না, সব সন্ন্যাসীর উদ্দেশ্যেও এক কথা বলছেন না। শ্রীম-কে ঠাকুর যেভাবে নির্দেশ দিচ্ছেন, গিরিশচন্দ্র ঘোষকে নির্দেশ দিচ্ছেন ভিন্ন ভাবে। শ্রীম ও গিরিশচন্দ্র একই সংসারধর্মের অধিকারী হলেও তাঁদের আধার ভিন্ন ভিন্নভাবে গড়ে উঠেছে, পারিবারিক ও পারিপার্শ্বিক প্রভাবে। সেইসব প্রভাব ও উত্তরাধিকার স্মরণে রেখে শ্রীরামকৃষ্ণ ভিন্ন ভিন্ন সুরে বাঁধছেন এক-একজনের জীবনগীতি। সন্ন্যাসী সন্তানদের মধ্যেও, তাঁর চোখে নরেন্দ্রনাথের যে আধার, রাখাল বা শরৎ বা লাটুর আধার নরেনের চেয়ে আলাদা, আবার একে অন্যের চেয়েও ভিন্ন। ফলে সাধনার যে পথ, যে কাজ ঠাকুর নরেনের জন্য ধার্য করছেন, রাখালের জন্য ভিন্নতর একটি পথ রাখছেন তিনি। আবার শরতের পথ যেটি, সেটি কোনোদিনই নরেনের পথ হবে না। ফলত, অধিকারী ও আধারভেদে শ্রীরামকৃষ্ণের আলোচনা-উপদেশ প্রত্যেকের জন্য স্বতন্ত্র এক একটি রূপ নিত, কিন্তু উদ্দিষ্ট বস্তুটি সবার ক্ষেত্রেই এক থাকতো।
তৃতীয় যে বিষয়টি, অর্থাৎ 'পরিস্থিতি' – একটিমাত্র উদাহরণের মধ্য দিয়ে একদম জলের মতো বুঝে নেওয়া যায়। ১৮৯৭ সাল; স্বামীজী প্রথমবার পাশ্চাত্য থেকে দেশে ফিরেছেন। দক্ষিণাত্যের নানা স্থানে, নানা সভায় বক্তৃতা করছেন 'ভারত'-এর ধারণা ও নতুন ভারত গড়ে তোলার কলাকৌশল নিয়ে। মাদ্রাজে যে মানুষটি 'আমার সমরনীতি' বক্তৃতায় উপস্থিত শ্রোতৃমন্ডলীর শিরায় আগুন ছুটিয়ে দিচ্ছেন 'গীতাপাঠ অপেক্ষা ফুটবল খেলা ভালো', অথবা 'আগামী পঞ্চাশ বছরের জন্য আমাদের একমাত্র আরাধ্যা দেবী হোন আমাদের দেশমাতৃকা; বাকি সব দেবতা এখন নিদ্রা গিয়েছেন' এই কথাগুলি বলে, সেই মানুষটিই রামেশ্বরম মন্দিরে বক্তৃতা রাখছেন ভক্তিমার্গ নিয়ে, যথার্থ বৈদিকমতে ঈশ্বরপূজার প্রাসঙ্গিকতা নিয়ে।
এই মারাত্মক বৈপরীত্য কেন? এখানেই, স্বামীজীর বক্তৃতাগুলি পেরিয়ে একটুখানি ঢুকে পড়তে হয় তৎকালীন ইতিহাসের পাতায়। দেখতে হয়, মাদ্রাজে স্বামীজীর শ্রোতারা ছিলেন প্রধানত তরুণগোষ্ঠী, যাঁরা টগবগে রক্তে ফুটছেন দেশের স্বাধীনতা আনার কাজে প্রাণ দিয়ে দেওয়ার অধিকারে। তাঁদের পরিবার, লোকাচার, সংস্কার পিছু টানছে, হয়তো বা দ্বিধান্বিত করে তুলছে। সেই পরিস্থিতিতে উচ্চারিত হচ্ছে স্বামীজীর বজ্রনির্ঘোষ – বাকি সব দেবতা নিদ্রা গিয়েছেন, একমাত্র জেগে আছেন দেশমাতৃকা, একমাত্র তিনিই আরাধ্যা।
আর অন্যদিকে, রামেশ্বরম মন্দিরে স্বামীজীর শ্রোতৃমন্ডলীতে উপস্থিত 'শুদ্ধাচারী' হিন্দু পূজারীরা। তাঁদের অধিকার সাকার উপাসনায়, মূর্তিপূজায়। তাই, তাঁর গুরুর কথা মেনে স্বামীজী রামেশ্বরের পূজারীদের অধিকারবোধে আঘাত করছেন না একবারের জন্যও; বরং, কী যত্ন করে দেখিয়ে দিচ্ছেন, শুদ্ধ ভক্তি কাকে বলে, কেন মৃণ্ময়ী বা মর্মর মূর্তির আড়ালে চিন্ময়ী সত্ত্বার পূজার আসল প্রয়োজন!
বক্তা হিসাবে বিবেকানন্দের সামনে দু জায়গায় দুই রকম পরিস্থিতি; দুই প্রকার অধিকারী। কারো আত্মমর্যাদা এতটুকু ক্ষুণ্ণ না করে, যে যেই কাজে ব্রতী তাঁকে সেই কাজের পথে আরও দৃঢ়ভাবে এগোনোর পরামর্শ দিলেন তিনি।
ঠাকুর যাকে বলতেন 'ভাব নষ্ট না করা', স্বামীজী তাকেই বলতেন 'কাউকে না চটানো'। আমেরিকা থেকে গুরুভায়েদের লিখছেন – 'কাউকে চটাতে হবে না। All the powers of good against all the powers of evil – এই হচ্ছে কথা। ... Do not insist upon every-body's believing in our Guru."
বেজায় অবাক হয়েছিলেন গুরুভায়েরা। নরেন এ কী বলছে! গুরুর প্রচার করবো না কারো কাছে? কিন্তু তাঁদের 'নরেন' অনেকটা এগিয়ে ভাবছেন। তাঁর মাথায় গুরুর আদর্শ, গুরু দ্বারা ন্যস্ত কাজ অনেক আগে – একটি মানুষেরও ভাব নষ্ট না করে, কারো থেকে একটিও অভিশাপ না কুড়িয়ে, কেবলমাত্র ভালোবাসা ও গ্রহণের দ্বারা দেশ ও জাতিকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়া। তাঁর গুরুকে যাঁরা ভালোবাসবে, নিজে থেকেই সেই পরম আশ্রয়ে আসবে একদিন। কিন্তু জোর করে গুরুকে চাপিয়ে দিতে গিয়ে অন্যের ভাব নষ্ট করা যেন না হয়, এ স্বয়ং তাঁর গুরুরই আদেশ ছিল।
এই বিষয়গুলি খেয়াল রেখে যদি শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দের কথা পড়া যায়, তাঁদের কথার ফাঁকে ফাঁকে আপাত-স্ববিরোধী স্বরগুলিকে কিন্তু এক তারে বাঁধা সম্ভব। সব ঘড়িরই উদ্দেশ্য সময় বলা, তা বলে সব ঘড়ি তো আর এক সময়ে বাঁধা যায় না, তাই না?
তেমনই, সকলেরই উদ্দেশ্য সত্য-উপলব্ধি। কেমন ভাবে উপলব্ধি করা যেতে পারে, সে নিয়ে নানা মুনির নানা মত। তাই, নানা পথ। ধ্বংসাত্মক পথ ব্যতীত একটি পথকেও তুচ্ছজ্ঞান করেন নি শ্রীরামকৃষ্ণ ও বিবেকানন্দ। সরগমের সাতটি স্বরেই তাঁদের ভাব তাই বেজেছে।
Comments
Post a Comment