মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত

অন্তরে যদি দরাজ না হতে পারি, বাইরে বাড়ির সবকটি জানলা খুলে রেখে সুবিধে হবে না। মন যদি আচ্ছন্ন হয় অন্ধ সংস্কারে, চলন-বলনে ফিটফাট বাবুটি হয়েও বিশেষ লাভ হয় না।

বাহিরবাড়িতে খালি চোখে যা দেখা যায়, সে তো লোকসজ্জার অংশ। অন্তর নির্মল না হলে, বাইরের সেই স-অ-ব আড়ম্বর লোক-দেখানো।

রবি ঠাকুর লিখছেন –
লক্ষ্মী যখন আসবে, তখন কোথায় তারে দিবি রে ঠাঁই?

লক্ষ্মীশ্রীকে বরণ করে তাকে বৈভবে মুড়ে সদর বৈঠকখানায় বসিয়ে রাখতে আমরা চির-উদ্যত। কিন্তু এতকিছুর মাঝে ভুলে যাই নিজের দিকে তাকাতে –
দ্যাখ রে চেয়ে আপন পানে, পদ্মটি নাই, পদ্মটি নাই।

লক্ষ্মী আমার অলংকার-আড়ম্বরের বাহিরবাড়িতে বসতে আসেন নি। তাঁর একমাত্র স্থান আমার হৃদয়পদ্ম। সেই হৃদয়টিকে যদি না তাঁর বাসযোগ্য করে তুলি, ফুলে-মালায়-আলোয় কী কাজ? শ্রীরামকৃষ্ণের কথা – ভক্তের হৃদয় ভগবানের বৈঠকখানা।

যুগের পর যুগ ধরে মহম্মদ, বুদ্ধ, শ্রীচৈতন্য, কবীর, নানক, লালন, গালিব কেবল বলে গেছেন – হে মানুষ, অন্তরে তাকাও। নিজের দিকে তাকাও। নিজেকে যোগ্য করে তোলো। নিজের হৃদয়বেদীটি যত্ন নিয়ে ধুয়ে-মুছে রাখো প্রতিদিন। আপামর প্রাণীজগৎ যেন সেই হৃদয়ের উষ্ণতা ছুঁতে পারে, তোমার হৃদয় যেন মৃতের সঞ্জীবনী হয়ে ওঠে। ঈশ্বর থাকলে, এই সবেই আছেন।

তাই, শ্রীরামকৃষ্ণ হাসতে হাসতে বলছেন –
মন নিয়ে কথা। মনেতেই বদ্ধ, মনেতেই মুক্ত। মন যে রঙে ছোপাবে, সেই রঙে ছুপবে। যেমন ধোপাঘরের কাপড়।

মন যেখানেই থাক, যেখানেই যাক, আমরা যেন প্রেম ও ত্যাগের রঙে তাকে রঙিন করতে পারি।

Comments