ধর্ম-অধর্ম

ধর্ম কাকে বলি? 

রবি ঠাকুরের শরণাপন্ন হওয়া যাক কিছুক্ষণের জন্য। 'আত্মপরিচয়' বইতে তিনি স্পষ্ট ভাষায় বলছেন – 'আমার সমস্ত জীবন দিয়ে যে জিনিসটাকে সম্পূর্ণ আকারে গড়ে তুলতে পারব সেই আমার চরমসত্য।' আরও একটু খোলসা করছেন, ধর্ম তাঁর কাছে 'একটা নিগূঢ় চেতনা, একটা নূতন অন্তরিন্দ্রিয়।' কী হবে এই চেতনা দিয়ে? কবির উত্তর – 'আমি ক্রমশ আপনার মধ্যে আপনার একটা সামঞ্জস্য স্থাপন করতে পারব – আমার সুখ-দুঃখ, অন্তর-বাহির, বিশ্বাস-আচরণ সমস্তটা মিলিয়ে জীবনটাকে একটা সমগ্রতা দিতে পারব।'

সহজ কথায় বলতে গেলে – এই নিগূঢ় চেতনাই আমাদের ধারণ করে। এবং যা আমাদের ধারণ করে, কে না জানে সে-ই 'ধর্ম'! এই নিগূঢ় চেতনা কিসের সমষ্টি? এই প্রবহমান যাপনচিত্রে সময়ের জল বয়ে গেলে সব ঝেপসে যাওয়ার পরে যা কিছু স্থায়ী পড়ে থাকে – চিরন্তন, আনন্দময় বোধস্বরূপ – তাইই আমাদের চেতনা, আমাদের ধারণ করে থাকা 'ধর্ম'। পরিস্থিতিভেদে, সমাজে আমার অবস্থানভেদে, আমার নির্দিষ্ট কর্তব্যভেদে যা কিছু আমার অন্তরে সৎ আদর্শ ও ভাবনারূপে সকল binary বা বৈপরীত্যের মধ্য দিয়ে বুনে চলেছে আমার জীবনের জমি, যা আমার যাপনের দাঁড়িপাল্লার দুদিকেই সমান ওজন চাপিয়ে একটা সামঞ্জস্য রক্ষা করছে, তাইই আমার স্বধর্ম।

আমাদের শ্রুতিশাস্ত্র গড়ে উঠেছে মূলত এই আদর্শ ও মূল্যবোধের সমাহারে। তার ব্যাখ্যা হিসাবে স্মৃতিশাস্ত্রে যত উদাহরণ বা আচার উপাচারের মাধ্যমে চরমসত্য লাভের কথা থাকুক না কেন, আদর্শ ও মূল্যবোধ প্রতিটি যুগের মানুষের জীবনেই সবচাইতে বড় করে সত্যি। 'তাহার উপর আর কিছুই নাই'। ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ যেমন বলেন, আমরা পথ নিয়েই মারামারি-কাটাকাটি করে মরি, অথচ দেখি না পথের শেষে যে উদ্দেশ্য আছে, তা সবারই এক; ঠিক তেমনই, আমরা কতটা শাস্ত্র-অভিমুখী, আচার-উপাচারী তা দিয়ে যখন আমরা আদর্শবান কিনা সে হিসাব করতে বসি, হিসাব গুলিয়ে যেতে বাধ্য। শাস্ত্রের আচারগুলি এক-একটি পথ; নিশ্চিতভাবে বহু মানুষ সেই পথে চলেছেন, সে পথের দার্শনিক মূল্যও অনস্বীকার্য। কিন্তু সত্য-উপলব্ধির পথ কেবলমাত্র ওই একটিই বা কয়েকটি, এমন বললে 'সত্য' এবং 'পথ' গুলিয়ে ফেলে ভারি এক অনুচিৎ কাজ হয় সেটা।

আশেপাশে প্রায়শই খেয়াল করবেন, আপাতভাবে আচার-উপাচার বিষয়ে উদাসীন মানুষদের নিজস্ব, স্বতন্ত্র আত্মানুসন্ধানের পথগুলিকে 'গ্লানিময়' বলে দাগিয়ে দেওয়ার একটি প্রবণতা দেখা যায়। 

কিন্তু সত্যি বলতে কি, ধর্ম কথাটিকে সহজ ভাবে বুঝলে দেখা যাবে, 'ধর্মের গ্লানি' আচার-উপাচার না মানায় আসে না, বা আচার-উপাচার মানলেই নিজেকে ধার্মিক প্রমাণ করা যায় না। ধর্ম যদি হয় আমাদের ধারণ করে রাখা মূল্যবোধ ও আদর্শের সমষ্টি, তাহলে 'ধর্মের গ্লানি' হলো – যা কিছু এই ইতিবাচক, আশাপ্রদ, সমদর্শী আদর্শের বিরুদ্ধে খড়্গহস্ত হয়েছে, সেই সবকিছু। ত্যাগ ও নিঃস্বার্থপরতা যদি ধর্ম হয়, অধর্ম হলো ভোগ ও স্বার্থপরতার উদ্দাম, অশ্লীল নৃত্য।
শ্রীগীতার চতুর্থ অধ্যায়ে শ্রীকৃষ্ণ অর্জুনকে বলছেন সেই বিখ্যাত কথা – 'যদা যদা হি ধর্মস্যঃ গ্লানির্ভবতি ভারত'। যখন যখন ধর্মের গ্লানি এসে উপস্থিত হয়, এবং অধর্মের উদয় হয় – অর্থাৎ? যখন সতের উপর অসৎ ক্ষমতা ফলায়, নীতির বিরুদ্ধে দুর্নীতি প্রবল হয়ে ওঠে, তখনই 'সাধু'র (সতের) পরিত্রাণে, এবং দুষ্কৃতীর (অসতের) বিনাশে সেই পরমশক্তি পৃথিবীর বুকে ফিরে ফিরে আসেন – ধর্ম সংস্থাপনের উদ্দেশ্যে। অর্থাৎ, অসৎকে সরিয়ে পুনরায় সৎকে প্রতিষ্ঠা করার উদ্দেশ্যে।

তাহলে, এবার থেকে আমরা কয়েকটা ছোট ছোট বিষয় খেয়াল রাখতে পারি। যেমন –

১. 'ধর্ম' ও 'অধর্ম' আচার-উপাচারে বন্দি নয়। তাদের পরিসর বৃহত্তর, এবং মানবমনের গহীনে।

২. একজন আচার-উপাচার মেনে ধর্মচর্চা বা সাধন করা মানুষ যদি অন্যকে হীনজ্ঞান না করেন, তুচ্ছজ্ঞান না করেন, বা স্বার্থান্বেষী ক্ষতিকর প্রবৃত্তি যদি তাঁর না থাকে, তবে আমরা নিজেরা শাস্ত্রসম্মত রীতিনীতি না মানলেও, তাঁকে একটুও খাটো-চোখে দেখবো না। তাঁর পথে ও উদ্দেশ্যে তিনি সৎ থাকলে, তিনি প্রশ্নাতীত শ্রদ্ধাস্পদ।

৩. একইভাবে, কেউ শাস্ত্রসম্মত আচার-উপাচার না মেনে যদি নিজের মন ও সাধ্যমতো স্বতন্ত্র পথে নিজেকে চিনতে চায়, সত্যকে উপলব্ধি করতে চায়, এবং তাঁর যদি নিজপথ ব্যতীত অন্য পথের প্রতি অসূয়া, হীন মনোভাব বা ক্ষতি করার প্রবৃত্তি না থাকে, তাঁকেও আমরা একইরকম শ্রদ্ধা ও সম্মান জানাবো।

সর্বোপরি, মনে রাখবো – যে যতই বলুক, আমাদের ধর্ম খুব বুনিয়াদি কিছু মূল্যবোধের মধ্য দিয়ে আমাদের সকলের মধ্যে উপস্থিত। তার সঙ্গে মন্দির-মসজিদে যাওয়া না যাওয়া, তিলক কাটা বা ফেজটুপি পরা, কিছুই যুক্ত নয়। আমরা সমদর্শী কিনা, শ্রদ্ধাশীল কিনা, সংবেদনশীল কিনা – এই হলো কথা। এগুলি থাকলে ধর্ম। না থাকলে ধর্মের গ্লানি।

এই আদর্শের দিকে যে যেই পথে যেতে চায়, যাক না! হলোই বা একটু নতুন, অজানা পথ! ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ বলছেন, কেউ পুরী যাবে; রাস্তাঘাট কিছুই না-জেনে সে উত্তরদিকে হাঁটা দিল। তবু, তার ইচ্ছা ও উদ্দেশ্য যদি ঐকান্তিক হয়, ঠিক কেউ না কেউ তাকে পথে বলে দেবে – ওহে, এদিকে নয়, দক্ষিণে যাও। পথ সে পাবেই। সত্য সে পাবেই।

Comments