মা

একটা সময় পেরোলে জীবনে জল ও বাতাসের মতোই খুব নিয়মিতভাবে বিপন্নতাবোধ আসে। ব্যর্থতাগুলো তীব্র সুরে বাজতে থাকে। আমরা বুঝি, শরীরের কোনও দুরারোগ্য অসুখ যদি বা দৈবাৎ সেরে যায়, এই বিপন্নতাবোধ সারাজীবনে আর ছাড়ে না।

তখন, বিধিবিহিত সবকিছুই পণ্ড বলে মনে হয়। আশা, আকাঙ্খা, প্রতিশ্রুতির মতো বড় বড় শব্দ অভিধানেই সুন্দর লাগে – সুসজ্জিত, গোছানো, আবেগরহিত। আগে, জীবনের বড় বড় সমীকরণে সমান চিহ্নের দুই পাশ অবলীলায় কাটাকুটি করে যেমন মিলিয়ে দেওয়া যেতো, এখন প্রথমেই কেটে দিতে হয় ওই সমান চিহ্নটি। তার দুই পাশ কিছুতেই আর মেলে না।

তখন কি প্রয়োজন সৈন্যের? যুদ্ধদামামার? অধিকারের দম্ভের? পরাক্রমশালী গর্জনের? বিজয়ীর হাসির?

না। তখন প্রয়োজন কেবল আশ্রয়ের। নিশ্চিন্তে, নির্বিঘ্নে রোদ, ঝড়, জল থেকে বেঁচে একটা দিন, একটা রাত সময় পাওয়া, শুশ্রূষার। হতদরিদ্র, একেবারে পথে বসে যাওয়া এই মনের শুশ্রূষা করবে কে তখন?

তখন, মা।

শ্রীরামকৃষ্ণের সাধনার কঠোরতা তখন আমাদের জন্য নয়, স্বামী বিবেকানন্দের ইস্পাতপ্রতিম আত্মপ্রত্যয় তখন বহু দূরের আলোকবর্তিকা। বেদ-বেদান্তের জ্ঞানদর্শন তখন উড়ে যায়। জেগে থাকে একটিমাত্র কথা – "ভয় কি বাবা, আমি তো রয়েছি। আমি মা থাকতে ভয় কি?" জয়রামবাটিতে মায়ের আশ্রমে আজও কদিন আদরে-স্নেহে থেকে, তাঁর সন্তানকে যখন ফিরতে হয় বহির্জগতে, কর্মে, দ্বন্দ্বে, দ্বিধায় – বেরিয়ে আসার মুখে আশ্রমের মূল দরজায় গোটা গোটা অক্ষরে লেখা থাকে এই কথাগুলি।

অভয়দানের প্রথম ধাপ, প্রাপকের ভয়টি স্বীকার করা, সেই ভয়কে মান্যতা দেওয়া। মা নিজের জীবনপাত করে সন্তানদের জন্য সর্বপ্রথম এই কাজটি করেছেন। কোনও idealistic কথা নয়, কোনও উচিৎ-অনুচিতের নিষেধাজ্ঞা জারি করা নয়। প্রশ্নাতীত গ্রহণ। আশ্রয়প্রার্থীকে আশ্রয়দানেরও আগে থাকে তার নিরাশ্রয় অবস্থাকে হেয়ো না করে, তাচ্ছিল্য না করে, সসম্মানে গ্রহণ করা। ওই গ্রহণেই ঠিক হয়ে যায়, আগামীর আশ্রয় দান হতে চলেছে, না সেবা।

তাই, 'শিবজ্ঞানে জীবসেবা'র যে ধর্ম, তার স্বতঃপ্রকাশ যদি হন ঠাকুর, যদি তার শ্রেষ্ঠ ব্যাখ্যাকর্তা হন বিবেকানন্দ, মা সেই ধর্মেরই মূর্ত, ব্যবহারিক প্রতীক। 

শ্রীরামকৃষ্ণ তাঁকে বলেছিলেন, এত সন্তান 'মা' বলে ডাকবে একদিন, ভেবে কূল পাবে না কাকে ছেড়ে কার ডাকে সাড়া দেবে। নিজের বলা কথার প্রথম পরীক্ষা স্বয়ং শ্রীরামকৃষ্ণকেই দিতে হয়েছিল। সারদাদেবী যেন ঠাকুরের মধ্যাহ্নের খাবারটি নিজহাতেই নিয়ে আসেন, যেন আর কারো হাতে না পাঠান – এ নিয়ে মা-কে প্রতিশ্রুতিবদ্ধ হতে বলে শ্রীরামকৃষ্ণ উত্তর পেয়েছিলেন, "আমাকে যদি কেউ 'মা' বলে ডেকে কাজটি করতে চায়, আমি তাকে ফেরাতে পারবো না।" উদ্ধৃতিগুলি বই দেখে লিখছি না, শব্দের এদিক-ওদিক হয়ে যেতে পারে। কিন্তু এখানে ভাবটি আসল। এই ভাবকেই ঠাকুর বলতেন, জাতসাপের লেজে পা পড়লে ফোঁস করে ওঠা।
এই ভাবের জন্যই 'মা' বলে ডেকে কেউ শ্রীশ্রীমায়ের আশ্রয়হারা হন নি। এই ভাবের জন্যই তখনকার সেসব দিনেও নিজেদের জাতবিচার না করে জয়রামবাটিতে মায়ের উঠানে বসে সকল সন্তান একসঙ্গে মুড়ি আর জিলিপি খেয়েছে। এই ভাবই 'খণ্ডন-ভব-বন্ধন'-এর "প্রেমার্পণ সমদরশন" – যে সমদর্শিতায় শরৎ এবং আমজাদের মধ্যে দুটি ভিন্ন নাম ব্যতীত আর কোনও ভিন্নতা থাকে না। যখন বিপ্লবীচেতনায় উদ্বুদ্ধ সন্তান মা-কে বলেন, "মা, তুমি একবার বলো, ওই ইংরাজগুলো উৎসন্নে যাক", মা একইভাবে উত্তর দেন "দেশ স্বাধীন হোক, বাবা। তা বলে কারো উৎসন্নে যাওয়ার কামনা করবো কেন? ওরাও আমার সন্তান।"

"ওরাও আমার সন্তান।" আর এই 'ওরা'-র কোনও সীমা পরিসীমা নেই। রাজনীতির 'আমরা-ওরা'র খেলা তো নয়; মায়ের কাছে সকলের তরে সকলে 'আমরা'। 

তাই মায়ের কথা, মায়েদের কথা রোজ রোজ বলা যায় না। জগৎ-চালনার অগ্নিস্ফুলিঙ্গ তাঁরা এমনই অবলীলায় ন্যাতা-কাঁথায় মুড়ে রাখেন – কিছু না বলতেই তাঁরা বুঝে যান, সন্তানের অসহায়তা, যন্ত্রণা কোথায়। কোন ব্যাধির কীসে নিরাময়, তাঁরা বোঝেন। এই কোমল, স্নেহপরায়ণ, মাতৃত্বের বিশাল বৃক্ষছায়া হতে হতে তাঁরা বোঝেন, সন্তান যা চাইছে তা পৃথিবীর সবচেয়ে দুর্লভ বস্তু – শান্তি। এও তাঁদের জানা, হাত-পা ছুঁড়ে, অস্থির হয়ে শান্তি আজ অব্দি আসেনি, আসবে না। শান্তিলাভের উপায় পরনিন্দা নয়, পরচর্চা নয়, 'আমি কিছুরই যোগ্য নই' বলে বিলাপ করা নয়। এক এবং একমাত্র পথ – নিজেকে দিনের পর দিন, ক্রমাগত যোগ্য থেকে যোগ্যতর করে তোলা, নিজের বোধকে সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর করে তোলা। সেই বোধের তরঙ্গে তখন ধরা পড়বে ব্রহ্মাণ্ডব্যাপৃত চিরশান্তি, যার খোঁজে আজ আমরা কাটাকাটি করে মরছি। 

কিন্তু যতদিন না সন্তান স্বাবলম্বী হচ্ছে, প্রত্যয়ী হয়ে উঠে দাঁড়াচ্ছে সাহসে, ততদিন মায়েরা অনন্ত ধৈর্যগুণে সন্তানকে আগলে বসে থাকেন নির্বিবাদে – সমস্ত ভয়, অসূয়া, ঘৃণা, বিদ্বেষের দিকে তাঁদের  জ্যোতির্ময়ী, তীক্ষ্ণ দৃষ্টি থাকে, যেমনভাবে এই ছবিতে মা বসে আছেন সেই অঙ্গীকারবদ্ধ হয়ে। ততদিন বিধির সাধ্য নেই, তাঁর সন্তানকে কিছু করে।

আজ, মায়ের জন্মতিথিতে সকল মায়ের মধ্যে অধিষ্ঠিতা সেই মাতৃশক্তিকে আমার প্রণাম।

Comments