প্রসঙ্গ 'কল্পতরু উৎসব'
১৮৮৬ সালের পয়লা জানুয়ারি কাশীপুর উদ্যানবাটিতে শ্রীরামকৃষ্ণের আশীর্বচনকে কেন্দ্র করে তাঁকে কল্পতরু-জ্ঞানে পূজা করার সূচনা।
ওইদিন ঠাকুরের আশীর্বচন শুনে উপস্থিত মানুষ আনন্দে বিভোর হয়েছিলেন। ইতিপূর্বেও ঠাকুরের সঙ্গ কাউকেই কোনোদিন আনন্দ থেকে দূরে রাখেনি, তবে সেদিনের যে আনন্দ, শোনা যায় তা অন্যদিনের মহানন্দ অপেক্ষাও ভিন্ন। শ্রীম-কথিত কথামৃতে এই দিনটির উল্লেখ পাওয়া যায় না; সারদানন্দ-রচিত লীলাপ্রসঙ্গে পাই, "স্বার্থগন্ধহীন তাঁহার সেই গভীর আশীর্বাণী প্রত্যেকের অন্তরে প্রবল আঘাত প্রদানপূর্বক আনন্দস্পন্দনে উদ্বেল করিয়া তুলিল।"
যে আশীর্বচনটিকে ঘিরে এত আনন্দাশ্রু, উন্মাদনা, কী সেই কথাটি? এতদিনে আমরা সবাইই জানি; ঠাকুরের চিরাচরিত উপমাত্মক কথা নয়, এমনকি সহজ ভাষায় কিছুর ব্যাখ্যাও নয়। কথাটি প্রায় চোখ এড়িয়ে যাওয়ার মতো, তাঁর পূর্বাপর এত কথার ভিড়ে –
"তোমাদের কী আর বলব! আশীর্বাদ করি, তোমাদের চৈতন্য হোক।"
এত দীর্ঘ কথামৃতের শেষে, এত উপমা, উপদেশ, প্রতীক, ভক্তি, জ্ঞান, সাধনা, মত, পথ শেষে এইই হলো শেষেরও শেষ কথা।
আজকের দিনকে কেন্দ্র করে কল্পতরু উৎসবের একশো-চল্লিশ বছর হতে চললো প্রায়। ওইদিন ঠাকুরের যে ভাব দেখা গিয়েছিল, তার প্রামাণ্য দলিল স্বামী সারদানন্দের 'শ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ'। শয়ে শয়ে মানুষ লীলাপ্রসঙ্গের দ্বিতীয় ভাগের একদম শেষাংশে লিখিত ওই দিনের বর্ণনা উদ্ধৃত করেন।
কিন্তু তার ঠিক পরের অনুচ্ছেদেই খুব গুরুত্বপূর্ণ একটি কথা সারদানন্দ লিখেছেন; ঠাকুরের অবতারত্ব, কল্পতরুবাদে বিশ্বাসী মানুষেরা সে জায়গাটা অব্দি পৌঁছন না, বা পৌঁছেও এড়িয়ে যান। অংশটি একবার পড়া যাক –
"রামচন্দ্র (দত্ত) প্রমুখ কোন কোন ভক্ত অদ্যকার এই ঘটনাটিকে ঠাকুরের 'কল্পতরু' হওয়া বলিয়া নির্দেশ করিয়াছেন। কিন্তু আমাদিগের বোধ হয়, উহাকে ঠাকুরের *অভয়-প্রকাশ* অথবা *আত্মপ্রকাশপূর্বক সকলকে অভয়-প্রদান* বলিয়া অভিহিত করাই অধিকতর যুক্তিযুক্ত। প্রসিদ্ধি আছে, ভাল বা মন্দ যে যাহা প্রার্থনা করে কল্পতরু তাহাকে তাহাই প্রদান করে। কিন্তু ঠাকুর তো ঐরূপ করেন নাই, নিজের দেব-মানবত্বের এবং জনসাধারণকে নির্বিচারে অভয়াশ্রয়প্রদানের পরিচয়ই ঐ ঘটনায় সুব্যক্ত করিয়াছিলেন।" (শ্রীরামকৃষ্ণ লীলাপ্রসঙ্গ, দ্বিতীয় খণ্ড, পৃষ্ঠা ২০১)
জাগতিক মোহ-মায়ায় আবিষ্ট দীনহীন ভক্তকুলের একজন প্রথামাফিক দেবতা বা অবতার থাকলে সুবিধা হয়, যিনি আলাদিনের দৈত্যের মতো made-easy কৌশলে প্রত্যেকের যাবতীয় লঘু-গুরু মনোবাঞ্ছা সফল করতে পারেন। কাজেই, সেদিনের অনাবিল আনন্দের মুহূর্ত থেকে যদি একটি সরলরেখা টানা যায়, অনতিদূরেই যে ভক্তেরা তাকে অবতার/দেবতায় মিলিয়ে দেবেন, এ তেমন আশ্চর্যের কিছু নয়। যেমন এটিও আশ্চর্যের নয় যে আগামীতে, সেই সূত্র ধরেই হাজার হাজার ভক্ত 'ওইদিন' ঠাকুরের কাছে গিয়ে 'কিছু চাওয়া'কে শনি-মঙ্গলবারের পূজার সঙ্গে এক করে দেখবেন। কিন্তু সারদানন্দের এই ব্যাখ্যা যে কত গভীরভাবে ঠাকুরের জীবন ও দর্শনের সঙ্গে সম্বন্ধিত, যাঁরা জানেন তাঁরা জানেন।
সাধারণ ভাষায় যাকে বলে miraculously 'হইয়ে দেওয়া' বা 'পাইয়ে দেওয়া', শ্রীরামকৃষ্ণ আজীবন ধিক্কার দিয়েছেন সেই 'সিদ্ধাই'কে। কথামৃতের প্রতিটি অধ্যায় তার প্রমাণ; মুখে ফেনা তুলে তিনি বলে চলেছেন, তাঁর মূল মন্ত্র একটিই – শুদ্ধাভক্তি ও সাধনা। মূল লক্ষ্যও একটি, ওই 'চৈতন্য হোক'। সাধনা ছাড়া, ব্যাকুলতা ছাড়া, অধ্যবসায় ছাড়া যা কিছু পাওয়া যেতে পারে, ঠাকুর যদি সে-সবের কল্পতরু হন, মিথ্যে তাঁর জীবন, বাণী, সাধনা।
তবু যা হোক, এই দিনটির মাহাত্ম্য অনস্বীকার্য। কল্পতরু উৎসবেরও দীর্ঘ ইতিহাস, এবং ঠাকুর অবতারত্ব নিয়েও তর্ক বিতর্কের শেষ নেই। তবে যার যেমন ভাব, তাতেই ডাকা যায় – তিনিই বলে গেছেন। মূল কথা হলো, যে পথেই ডাকি, তাঁর মূল ভাবটুকু থাকছে তো?
এই বিতর্কের সমাধান স্বামী বিবেকানন্দ তাঁর মতো করে করেছিলেন। এমন কথা তাঁর মুখেই মানায়। শ্রীরামকৃষ্ণ অবতার কিনা, এই প্রশ্নের উত্তরে স্বামীজী বলেছিলেন, "অবতারের বাপ।" যা বোঝার, এটুকু থেকে বুঝে নিতে হয়। খোলসা করার জন্য স্বামীজীর আরও একটি কথা কাজে লাগে; এই পোস্টের সঙ্গে ছবি আকারে কথাটি দেওয়া রইল।
Comments
Post a Comment