মাতৃবন্দনা
১৮৯৪ সালের ক্রিসমাসের দিন ৩ নং গৌরমোহন মুখার্জি লেনে, দত্তদের বাড়িতে ভুবনেশ্বরী দেবীর কাছে একটি চিঠি এসে পৌঁছেছিল মার্কিন দেশ থেকে। চিঠিতে লিখিত বয়ানটির নীচে সই করেছিলেন বারো জন মহিলা – তৎকালীন আমেরিকায় National Women's Suffrage Association এবং Women's Liberation Movement-এর ভ্রুণাবস্থার কার্যক্রমের সঙ্গে তাঁরা যুক্ত প্রত্যেকেই। চিঠির বয়ানটি এরকম –
"Dear Madam,
At this Christmas tide when the gift of Mary's son to the world is celebrated and rejoiced over with us, it would seem the time of remembrance. We, who have your son in our midst, send you greeting. His generous service to men, women and children in our midst was laid at your feet by him the other day, in an address he gave us on the ideals of 'Motherhood in India'. The worship of his mother will be to all who heard him an inspiration and uplift.
Accept, dear Madam, our grateful recognition of your life and work in and through your son.
And may it be accepted by you as a slight token of remembrance, to serve in its use as a tangible reminder that the world is coming to its true inheritance from God of Brotherhood and Humanity."
ভারতে মাতৃত্বের আদর্শ নিয়ে কথা বলতে গিয়ে স্বামী বিবেকানন্দ আমেরিকার শ্রোতৃমণ্ডলীর কাছে বলেছিলেন তাঁর গর্ভধারিণীর অসীম ত্যাগ, তিতিক্ষা ও প্রেমের কথা। ব্রাহ্মণ্যবাদী, পুরুষশাসিত, অব্রাহ্মণ ও নারীদের দাবিয়ে রাখা সমাজে জন্ম নরেন্দ্রনাথ দত্তের; তাঁর বিবেকানন্দ-রূপে উত্থানও আরেক পুরুষশাসিত সমাজে। অথচ নিজজীবনে নারীদের অবদান স্বীকারে বিবেকানন্দ কুণ্ঠাহীন। আদর্শের রূপায়ণের পথে তাঁর যে চলা, সঙ্গী হিসেবে পেয়েছিলেন বিদূষী, অনন্য ব্যক্তিত্বসম্পন্না কিছু নারীকে। কেউ শিষ্যা, কেউ বন্ধু, কেউ বা তাঁর 'মা', কেউ 'মেয়ে'। নিজের একটি বক্তৃতাতেও, এমনকি শিষ্যের সঙ্গে ঘরোয়া আড্ডাতেও বিবেকানন্দ সেই নারীদের নিজের উদ্দেশ্যসিদ্ধির 'instrument' হিসেবে দাগিয়ে দেন নি। তাঁর মতো হৃদয়ের মানুষ পুরুষ-নারী নির্বিশেষে কাউকে নিজের 'instrument' করে তুলতে উৎসাহী হবেন না, সেইই তো স্বাভাবিক। প্রত্যেকে তাঁর সতীর্থ; বেদান্তের তাত্ত্বিক সাম্যের যথাসাধ্য বাস্তবায়ন তাঁর ও সবার কাজ। পূর্বাশ্রম থেকে দূরত্ব বজায় রাখা সন্ন্যাসধর্মে বিবেকানন্দ হৃদয়হীন হয়ে ভুলে যেতে পারেন নি তাঁর inheritance; তাই দ্বর্থ্যহীন ভাষায় বলতে পারেন তিনি – "The love which my mother gave me has made me what I am and I owe a debt to her that I can never repay."
মাতৃত্বের কথা, নারীশক্তির কথা, নারীদের সমাজগঠনে অবদানের কথা সেইদিন বিবেকানন্দ যখন বলেছিলেন, তৎকালীন আমেরিকায় নারীদের ভোটাধিকার ও সামাজিক ক্ষমতায়ন নিয়ে সরব বারো জন মহিলার হৃদয় আন্দোলিত হয়েছিল। তারই প্রতিক্রিয়া উপরের ওই চিঠি। অনাচার-দুরাচারে আত্মবিস্মৃত, মাথা তুলে দাঁড়াতে না পারা, হীনবল, হতদরিদ্র এক দেশ থেকে তাঁর ছেলে চিরদিনের মতো বাড়িঘর ছেড়ে সন্ন্যাসী হয়ে কর্মব্যস্ত পাশ্চাত্যে গিয়ে বলেছে নিজের দেশের মায়েদের কথা, মেয়েদের কথা, আর যখন বলেছেন, তাঁর শরীরের প্রতিটি রেখায় ফুটে উঠেছে ভারতীয় হওয়ার গর্ব, এবং সেই ভাব স্পর্শ করেছে ও দেশের মানবহৃদয়, এবং অচেনা-অজানা কিছু মানুষ প্রতিদানস্বরূপ এই চিঠিটি লিখেছেন তাঁকে, বিবেকানন্দের 'making'-এ তাঁর অবদানকে স্বীকৃতি দিয়ে – সে কথা পড়ার সময়ে ভুবনেশ্বরী দেবীর উদ্ভাসিত মুখচ্ছবি আমাদের কল্পনায় শোভা পাক; সে অনুভূতিকে কোন ভাষা রূপ দিতে পারে!
ভারতে নারীজাগরণ ও তাঁদের সমাজে সক্রিয় অবদানে ব্রতী করার বিষয়টি শুধু বিবেকানন্দের প্রথম জীবনে নয়, শেষ জীবনেও একইভাবে তাঁকে তাড়িয়ে বেড়ায়। স্ত্রী-মঠ ও মেয়েদের জন্য বিদ্যালয় স্থাপন তাঁর স্বপ্নের কতটা জুড়ে ছিল, সে আজ সবারই জানা কমবেশি। ১৮৯৪-এর আমেরিকা থেকে যদি ১৯০১ সালের বেলুড় মঠে আমরা চলে আসি, দেখবো শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তীর সঙ্গে বসে আছেন স্বামীজী, বলছেন তাঁর স্বপ্নের 'স্ত্রী-মঠ'-এর কথা। শিষ্য ইতস্তত করছে – শেষে আবার ব্যভিচার বামাচারে না সব উচ্ছন্নে যায়! স্বামীজীর উত্তর – "এদেশে পুরুষ-মেয়েতে এতটা তফাত কেন যে করেছে তা বোঝা কঠিন। ... তোরা মেয়েদের নিন্দাই করিস, কিন্তু তাদের উন্নতির জন্য কি করেছিস বল দেখি? ... নিয়ম-নীতিতে বদ্ধ করে এদেশের পুরুষেরা মেয়েদের একেবারে manufacturing machine করে তুলেছে!"
আজ যখন গুগল বা সোশ্যাল মিডিয়ায় উঠে আসা মিম বা ট্রোলের মাধ্যমে বিবেকানন্দকে জানা মানুষের ধারণা হয় তিনি বাল্যবিবাহের বিপক্ষে কিছুই তেমন বলেন নি, তখন বিবেকানন্দ যে অবস্থান থেকে, যে নির্দিষ্ট প্রেক্ষিতে, যে সর্বস্তরের মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন, সেইটি বুঝতে হয়, এবং পড়তে হয় স্বামি-শিষ্য-সংবাদ। মেয়েদের বিদ্যালয় গড়ে তোলার পিছনে অনেক কারণের মধ্যে একটি সম্বন্ধে ধারণা করা যায়, যখন তিনি বলেন "স্ত্রী-মঠের ছাত্রীদের অভিভাবকেরা ১৫ বৎসরের পূর্বে তাদের বে দেবার নামগন্ধ করতে পারবে না – যে নিয়ম রাখতে হবে।" সমাজে case study বা instance setting এর মতো কেবলমাত্র কিছু বাল্যবিবাহ রদ করাই যে যথেষ্ট নয়, সেই প্রয়াস যে তাঁর অবর্তমানে আবার বন্ধ হয়ে ফিরে যেতে পারে অতীতের অন্ধকারে, সে কথা আন্দাজ করেছিলেন বিবেকানন্দ। তাই আপাতভাবে less-glamorous, less-fashionable পদ্ধতিতে বালিকাদের শিক্ষায় জোর দিতে চেয়েছিলেন। তাতে দীর্ঘমেয়াদি ফল হিসেবে তারা সুশিক্ষিত স্বাবলম্বী হবে, আর আশু কর্তব্য হিসাবে তাদের বিবাহ পিছিয়ে দেওয়া যাবে। বিবাহের বয়সটি তিনি যে ১৫-এ বেঁধেছিলেন, সর্বস্তরের মানুষের কথা ভাবলে, সেও তখন অনেক! আজও যে অঞ্চলে পড়াতে যাই, সেখানে এইচ এস পাশ করলে বা ১৮ পেরোলে গ্র্যাজুয়েশন ও বিবাহের মধ্যে বিবাহই বাছা হয় অধিকাংশ মেয়ের বাড়িতে। ফলত তৎকালীন সমাজে এই ছোট ছোট টার্গেটগুলি ভয় বা সমঝে চলা নয়, পরিস্থিতির বিচারে এই সবই baby steps towards greater dreams! সম্ভবত একেই বিবেকানন্দ 'My Plan of Campaign'-এ বলছেন 'Radical Reform' – "You must go down to the basis of the thing, to the very root of the matter. That is what I call radical reform. Put the fire there and let it burn upwards and make an Indian nation." শিক্ষা – এইই ছিল বিবেকানন্দের radical reform-এর অস্ত্র।
শেষ কদিন যে মাতৃশক্তির উপাসনা আমরা করলাম, যে নারীবন্দনা করলাম, তাঁকে তাঁর প্রাত্যহিক প্রকাশে যদি আমরা সাধ্যমতো সম্মানটুকু দিতে পারি আগামীতে, আরাধ্যা করে তুলতে পারি, তবে বোধ হয় দেবীর সঠিক পূজা হবে।
Comments
Post a Comment