আগে ভোগ হোক, ত্যাগ পরে হবে
শিষ্য শরচ্চন্দ্র চক্রবর্তী স্বামী বিবেকানন্দকে জিজ্ঞেস করছেন, ত্যাগের কথাই যদি বলেন তবে পশ্চিমের দেশে যেভাবে বেদান্তের আত্মা-ব্রহ্ম তত্ত্ব প্রচার করলেন এদেশেও সেভাবে করলেন না কেন, যাতে সংসারের জটিল কুটিল প্যাঁচ-পয়জার ত্যাগ করে ব্রহ্মতত্ত্বে লীন হয়ে যেতে পারি? সবশেষে লক্ষ্য তো ঐটিই!
বিবেকানন্দের উত্তর – এ দেশে কাকে বলবো সে কথা? তোদের ভোঁতা মগজ, দুর্বল শরীর। তমোগুণে আচ্ছন্ন তোরা। পাশ্চাত্য রজঃস্রোত দ্বারা ভোগের শিখরে পৌঁছেছে। ভোগ করেছে। এখন ভোগ ছেড়ে আরও কিছু চায়; তাই ভোগের অতীতে যা আছে, তার সন্ধান ওদের দেওয়া যায়। তোদের আগে ভোগ হোক, ত্যাগ পরে হবে।
কথাগুলি বিশ্লেষণ করলে অবাক হতে হয় এই কারণেই যে ত্যাগের আদর্শে, সন্ন্যাসধর্মে সুপ্রতিষ্ঠিত বিবেকানন্দ ব্রহ্মতত্ত্ব ও ব্রহ্মোপলব্ধি গন্তব্য জেনেও, ভারতের ক্ষেত্রে সে নিয়ে কোনও শর্ট-কাটে যাওয়ার কথা ভাবেন নি। স্টেপ-জাম্প করে যে অঙ্ক হয় না, বিবেকানন্দের উপরের এই কথাটিই তার সবচেয়ে বড় প্রমাণ। বহিঃশক্তির হাতে বারংবার অবদমিত হতে হতে, এবং তার চেয়েও বেশি নিজ-সমাজে বর্ণভেদে অভব্যতা ও দমন সহ্য করতে করতে, নিজের স্বতন্ত্র অস্তিত্ব বিসর্জন দিয়েছে ততদিনে ভারত। ততদিনে সে জড়বৎ; গুটিকয় ব্যতিক্রমী, চিন্তাশীল মস্তিষ্ক ব্যতীত সে অসহায়, নিরালম্ব, হীনম্মন্যতায় ভোগা, ভগ্নমনোরথ জীবপিণ্ডমাত্র। প্রভাবশালী ব্রাহ্মণশ্রেণীর স্বার্থপর শাস্ত্রব্যাখ্যা শুনে ভারতের অর্ধসিদ্ধ ধারণা হয়েছে কিছু; সে বেকারত্ব আর কর্মত্যাগে গুলিয়ে ফেলেছে, গুলিয়ে ফেলেছে অনাহার আর ভরপেটের মধ্যে। নিজেকে কেবলই সে স্তোকবাক্যে ভুলিয়ে চলেছে – তার এই অবস্থা আসলে অকর্মণ্যতা নয়, কর্মত্যাগ। আসলে সে শতাব্দীর পর শতাব্দী অভুক্ত, কিন্তু নিজেকে সে বুঝিয়েছে – খাদ্যতৃষ্ণার কামনা জয় করা একেই বলে।
স্বামী বিবেকানন্দের বিশেষত্ব এখানেই যে তিনি এই ফারাকটির টুঁটি চিপে ধরেছিলেন, এবং নির্দয়ভাবে তার সমালোচনা করেছিলেন। এখানেই আমরা তাঁর কাছে কৃতজ্ঞ; এখানেই আমরা তাঁকে না পারি ফেলতে, না গিলতে – কারণ আমাদের নিজেদের মিথ্যা মোহাবৃত করে রাখার মসৃণ, সুদৃশ্য পর্দাগুলিকে তিনি নির্দ্বিধায় ছিঁড়ে, আগুনে পুড়িয়ে দেন। এখানেই তাঁর ওই কথার প্রাসঙ্গিকতা – আগে ভোগ হোক, ত্যাগ পরে হবে। ত্যাগী সন্ন্যাসী সামাজিক অবস্থা অস্বীকার করে সকলকেই ব্রহ্মলাভের মন্ত্র দিলে দিলে তা নিতান্তই অধর্ম হবে, মনে করেছিলেন বিবেকানন্দ। পেটের ব্যামোয় জর্জরিত ভারতের জন্য গুরুপাক বেদান্ত যে কেবল অসুস্থতাই বাড়িয়ে তুলবে, মোহের চাদরটি পুরু করে তুলবে – তা বুঝতে বেগ পেতে হয়নি বিবেকানন্দকে। সে কারণেই অন্যত্র তিনি বলছেন, অভুক্ত মানুষের কাছে ধর্মের আচার-উপাচারের কথা বলা তাকে অপমান করার সামিল। যে মানুষকে বিদ্যা থেকে এতদিন দূরে রাখা হয়েছিল কারণ সে 'নীচজাত', আজ তাঁকে বিদ্যাদান সর্বাগ্রে প্রয়োজন; যে বাড়িতে দু দিনে একবার পাত পড়ে কি পড়ে না, সে বাড়িতে আগে এক দিনে দুবেলা পাত পড়া প্রয়োজন; যাঁর স্বাস্থ্য নেই, তাঁর শুশ্রূষা আগে প্রয়োজন; সমাজের নিষ্পেষণে যে আজ নির্ধন, ধনের বন্টন প্রয়োজন তাঁর দিকে। এতকিছুর পর গিয়ে সুধাসাগর; তবে না 'চিরসখা' এই 'জরাভারাতুর' দেশকে 'নবীন' করে তুলবেন!
বিশ্বায়নের ফলে পাশ্চাত্যের ভোগবাদী ধ্যানধারণায় ভেসেছি আমরা, সময় যত এগিয়েছে। ফলে কাজ আরও বেড়েছে আমাদের। এখনও ভারতের বৃহদংশ তিমিরাচ্ছন্ন, এবং বাকি অংশ নীতি-ধর্মহীন ভোগী। অথবা নীরব। অথবা বিবেকদংশনে জর্জরিত, নিঃসহায়, ভীত। ক্রুদ্ধ ও প্রতিক্রিয়াশীল।
ঠিক এই সময়েই বিবেকানন্দ-পাঠ আবার প্রয়োজন। মুগ্ধতার পাঠ নয়, খুঁজে দেখার পাঠ।
This is something that mesmerizes me about the person he was. When I read this idea, I was a teenager, and I think my whole perspective went through a metamorphosis. "Angur phol tok" had a different, a deeper, and much wider meaning. If one hasn't tasted something, how do they say that they have resigned on it? Such a subtle question, but so difficult to ask in the quiet time. We tend to ignore it altogether. To accept that we have desires, and we are and will always be, a mere human is so difficult at times. We usually tend to rush through to prove that we are beyond them.
ReplyDeleteBut I think like the story of 'Sohni-Mahiwal' (a folklore of Punjab), desires are made of raw, unhardened clay pot. We start jumping in the river with hardened ones, and that one day, suddenly the universe changes the hardened one with the raw one and we realize it, not before but after we jumped. We either die like Sohni did, or we learn to swim, to live, like the idea of Sohni did.
Thank you for putting a piece on this brilliant realization!
Thank you so much for the comment. ❤️ Loved the way you have seen him.
Delete