পরমান্ন
রাত নামলে, ভুবনেশ্বর মঠের সে এক অন্য রূপ। সারাদিনের কর্মব্যস্ততা কোথায় হারিয়ে গেছে তখন! সন্ধ্যার প্রার্থনাসভাও শেষ। আশ্রমের ভিতর অনেক দূরে দূরে একটি করে ল্যাম্পপোস্ট, তার সাদা আলোয় আশেপাশের কিছুটা দৃশ্যমান; বাকিটা নীরব, নিশ্ছিদ্র অন্ধকার। ও-পারে শহর তখন দিব্যি শশব্যস্ত, কিন্তু তার স্পর্শটুকু এসে পৌঁছয় না মঠের ভিতর।
এরই মধ্যে, ওই জমাট বাঁধা অন্ধকারে ফুটফুট করে কিছু টগর ফুল। তাদের দিব্যি দেখা যায়। গ্রীষ্মের থমথমে সন্ধ্যায় আচমকা এক দু বার হাওয়া দিলে তারা খুব খুশিতে মাথা নাড়ে। বাতাস চলে গেলেই, আবার খুব গম্ভীর।
রাখাল মহারাজের ঘরের দরজা বন্ধ। কেবল তাঁর বিছানার মাথার দিকের জানলাটি খোলা। সে জানলার নীচে দাঁড়িয়ে থাকি অনেক, অনেকক্ষণ। বড় মিষ্টি এক গন্ধ আসে – ঘর থেকে? তাইই হবে। হয়তো সেবক মহারাজ রাতের ধূপটি যে জ্বালিয়ে গেছিলেন, সেটিই জ্বলছে এখনও। জৈষ্ঠ্যের নিস্তরঙ্গ বাতাসে সে ঘন হয়ে আছে, ধীরে ধীরে ছড়িয়ে পড়ছে আশেপাশে। সেখানে দাঁড়িয়ে আমার ভাবতে ইচ্ছে করে, এই ঘ্রাণ রাখাল মহারাজেরই উপস্থিতি। যেন তিনি এখানেই, জানলার ওইপারে, ঘরের মধ্যেই। হয়তো বা শয়ন থেকে উঠে বসেছেন – একমনে ভাবছেন ঠাকুরের কথা। সেই অপূর্ব, পবিত্র ভাবনারাশিই যেন এই মিষ্ট গন্ধ হয়ে আসছে আমার কাছে; এভাবেই যেন তাঁরা যোগাযোগ করেন।
রাখাল মহারাজের ঘরের পাশ দিয়ে বারান্দাটি সোজা চলে গেছে খাওয়ার ঘরে। লম্বা লম্বা টেবিল আর বেঞ্চি পাতা সেই ঘরে; রাতের খাবারের আগে থালায় থালায় বেড়ে দেওয়া হচ্ছে ঠাকুরকে নিবেদন করা ভোগের কিছুটা। ভুবনেশ্বর মঠে দুপুরবেলা আবাসিকদের জন্য রাঁধা অন্যান্য খাবারের সঙ্গে থাকতো ঠাকুরকে নিবেদন করা সামান্য গোবিন্দভোগ চালের ভাত, আর একটু শুক্তো। ওই প্রসাদটুকু গ্রহণ করে, বাকি খাওয়া দাওয়া। মঠের খাওয়ার ঘরের পরিচিত দৃশ্য – মা উঠানে দুই পা সামনে মেলে বসে আছেন, সন্তানদের খাওয়াদাওয়ায় নজর রাখছেন। অন্নগ্রহণের আগে গীতার সেই মন্ত্র – ওঁ ব্রহ্মার্পণম ব্রহ্মহবির্ব্রহ্মাগ্নৌ ব্রহ্মণাহুতম ... ইত্যাদি। মন্ত্রটি মনে বসে গেছে, বলবার সময় কিছুটা mechanically-ই বলে ফেলি, আর নরেন্দ্রপুরের কথা মনে পড়ে যায়। হস্টেলে, পাতে ডাল আর ভাত পড়েছে, হাপুশ হুপুশ করে খাবো, এমন সময় "মন্ত্র বলো সবাই।" উফ, খাওয়া থামিয়ে আবার নিবেদনের ঝক্কি! ভেবে, হেসে ফেলি।
রাতে ভুবনেশ্বর মঠে ঠাকুরকে নিবেদন করা হয় ঘিয়ে ভাজা লুচি আর পায়েস। ঠাকুরের বড় প্রিয় দুটি পদ। শুরুতে পাতের লুচিটি খাই, একটু বেগুনভাজা দিয়ে। তারপর অন্যান্য পদের শেষে আসে এক হাতা করে পায়েস। বহুব্যবহৃত উপমা, তবু এ ক্ষেত্রে বলতে দোষ নেই – সে যেন সত্যিই অমৃত। পায়েস খেতে কত না ভালোবাসতেন ঠাকুর। গলরোগের সময়ে, বিশেষত শেষদিকে পায়েস ছাড়া আর কিছুই খেতে পারতেন না। কখনও সেটুকুও পারতেন না। বর্ণনায় আছে, এক একদিন ক্যান্সারের প্রবল যন্ত্রণায় তরল, নরম, সামান্য পায়েসটুকু গলা দিয়ে নামেনি; নাক মুখ দিয়ে বেরিয়ে এসেছে। মহাসমাধির কিছুক্ষণ আগে ঠাকুর প্রায় এক গেলাস পায়েসই খেয়েছিলেন। খেয়ে, বলেছিলেন, "আঃ! এখন আর কোনও রোগ নেই।"
সেই পরমান্ন মনে মনে তাঁকে আবার নিবেদন করে, গ্রহণ করি। ঘন করে জ্বাল দেওয়া দুধে সুজি দিয়ে ফোটানো পায়েস। কত স্বাদের, কত আনন্দের, কত যন্ত্রণার প্রতীক।
তিনি তো কত সয়েছিলেন। আর আমরা এটুকু জীবন পার করতে পারবো না?
Comments
Post a Comment