সঙ্গী

মে মাসে ভুবনেশ্বর মঠে দিনকয়েকের জন্য ছিলাম। কলেজে ক্লাসের বালাই নেই তখন; এক মাঝরাতের ট্রেন ধরে পরদিন ভোরবেলায় পৌঁছে গেছিলাম মঠে। চৌহদ্দির এক প্রান্তে একটি ভক্তনিবাসে, একজনের থাকার মতো ছোট্ট একটি ঘরে থাকতাম সেই কদিন। ঘরে আমার সঙ্গী বলতে ঠাকুর, মা, স্বামীজী ও রাখাল মহারাজের সুপরিচিত চারটি ছবি, এবং সন্ধে পেরোলে অসংখ্য কালো পিঁপড়ে, ও একটি নাতিকিশোর টিকটিকি।

জৈষ্ঠ্যের গরমে বেলা বাড়লে সেই ঘর খুব মনোরম লাগতো না, বলাই বাহুল্য। তখন দরজাটি খুলে রেখে, খাটে শুয়ে শুয়ে বই পড়তাম। উপরে কড়ি-বরগার সিলিং থেকে পুরোনো আমলের ফ্যান ঝুলছে – এমনিতে সে বেজায় হাওয়া দেয়, কিন্তু আধঘন্টায় একবার অন্তত এমন ঘটাং-ঘট করে, মনে হয় ট্রেনেই আছি, ট্রেন কোনও নদী পেরোচ্ছে।

থাকার ঘরের দরজাটির বাইরেই, একদিক-খোলা লম্বা বারান্দা। নিবাসের তিনটি wing আছে, বারান্দাটিও সেইমতো বেঁকেছে জায়গায় জায়গায়। বারান্দার ও পাশে মাথাখোলা চাতাল, আম আর চাঁপা গাছ। ওই চাঁপা গাছের দু তিনটি ডাল এসে থেমেছে একদম আমার ঘরটির দরজার কাছে। তাই দুপুরে দরজা খুলে রাখলে ফাঁকে ফাঁকে খুব মৃদু গন্ধ আসতো ফুলের। 

বেলা পড়লে মন্দির খুলতো, চারটে নাগাদ। দোতলায় ঠাকুর, মায়ের কাছে বসেই বেশিরভাগ সময়ে ধ্যান-জপ করতাম, কিন্তু আমার মন মাঝেমাঝেই চলে যেত একতলায়। সেখানে রাখাল মহারাজের থাকার ঘর, আর ঘরের সামনে চওড়া অনেকটা বসার জায়গা। মহারাজের ঘরটি এমনভাবে রাখা, যেন এই কাছেই কোথাও গেছেন তিনি। দরজার বাইরে ওই চওড়া জায়গায় আমরা যারা বসবো, তাদের দিকে মুখ করে রাখা একটি হেলান দেওয়ার মতো চেয়ার, মহারাজের ছবি রাখা তাতে। ভিতরদিকে খাট-বিছানা। দেরাজে পাট করে রাখা গেরুয়া বসন, দেওয়ালে হেলান দিয়ে দাঁড় করানো লম্বা একটি ছাতা। সেই ঘরের সামনে চোখ বুজে অনেকক্ষণ বসে থাকতাম এক একদিন। আমার বাঁ দিকে খোলা দরজাগুলির ও-পার থেকে, দেবদারু গাছের সারি পেরিয়ে বিকেলের হু-হু বাতাস আসতো। রাতে খাওয়া-দাওয়ার পর আলো নিভিয়ে দেওয়া আশ্রমের পথে হাঁটতে হাঁটতে কতবার ওই ঘরের কাছ দিয়ে যাওয়ার সময় ভিতর থেকে আসা আলগা মিষ্টি গন্ধ পেয়ে দাঁড়িয়ে পড়েছি। মানুষ থাকলে মানুষের যেমন একটি গন্ধ লেগে থাকে ঘরে, এই গন্ধও যেন তেমন। 

এক-একদিন রাতে, প্রায় মাঝরাত পেরিয়ে ঝড় উঠতো ভুবনেশ্বরে। চাতাল দিয়ে শুকনো আমপাতার খড়খড় শব্দ পেয়ে ঘরের দরজা খুলে বেরিয়ে আসতাম বারান্দায়। কিছুক্ষণ আগের নীরস, কালো আকাশ এখন ঘোলাটে। তীব্র নিস্পৃহতার তপস্যায় সে যেন ক্ষান্ত দিয়েছে। দমকা দমকা ঠাণ্ডা বাতাস এসে গায়ে লাগে, শরীর পেরিয়ে ঘরে ঢোকে। অন্ধকার উঠোন অজস্র তারার মতো চাঁপা ফুলে ভরে থাকে। কিন্তু একরাতে আমার সবচেয়ে আশ্চর্য লেগেছিল আরেকটি বিষয়। সেইদিন ওই বিরাট নিবাসটিতে আর কোনও জনমানুষ নেই, আমি একাই। ঘর থেকে বেরিয়ে বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছি, ঝড় হচ্ছে খুব। ওদিকের বারান্দাটিতে আলো জ্বলছে। মোটা মোটা থামের একদিকে ছায়া, আর অন্যদিকে আলো। আমার মনে হচ্ছিল, আলোগুলি যেন থামে হেলান দিয়ে আমার সঙ্গে সেই রাতে ঝড় দেখছে।

Comments