আমিও ছিলাম?

তাঁর নিজেরই কথা আমি মাঝেমাঝে তাঁকে পড়ে শোনাই। বেশিরভাগ দিনই কলেজ সেরে তাঁর কাছে এসে বসতে আমার বিকেল গড়িয়ে গোধূলি হয়ে যায়। একদিকে ভালো; তখন রোদ পড়ে এলে কিছু লোকজন গাত্রোত্থান করেন, রওনা দেন বাড়ির পথে। 

দিনের আলো মরে আসা ঘরের খাটটিতে তিনি বাবু হয়ে, বা পা ঝুলিয়ে বসে থাকেন অনেকদিন। আশেপাশে আমরা কজন। তাঁকে বলি, "এই দ্যাখো, রথের পুনর্যাত্রার দিন কী বলেছিলে বলরাম বাবুর বাড়িতে।" যেন কত অচেনা রাজপুত্তুরের রূপকথা তিনি শুনবেন, এভাবে নিজেই উৎসাহ নিয়ে এগিয়ে বসেন, "কোনটা, শুনি!"

আমি বলি, "ওই যে, শাক্ত আর বৈষ্ণবদের লড়াইয়ের কথা! বলরাম বাবুর পিতৃদেবকেও তো শোনাতে ছাড়ো নি, বলো! 'সব মতের লোকেরা আপনার মতটাই বড় করে গেছে। শাক্তেরাও বৈষ্ণবদের খাটো করার চেষ্টা করে। শ্রীকৃষ্ণ ভবনদীর কাণ্ডারী, পার করে দেন, – শাক্তেরা বলে, 'তা তো বটেই, মা রাজরাজেশ্বরী–তিনি কি আপনি এসে পার করবেন? – ওই কৃষ্ণকেই রেখে দিয়েছেন পার করবার জন্য'।"

ঘরে আমরা ক-জন হেসে উঠি। তিনি অনেকক্ষণ ধরেই মিটি মিটি হাসছেন। লোককে এসব বলে বিপাকে ফেলে না জানি কতই আনন্দ পেতেন! এ-কথা সে-কথা হয়, ঘরে আলো জ্বলে ওঠে। 

তিনি বলেন, "আর ও জায়গাটা বল – সেই বিশ্বম্ভরের ছোট্ট মেয়েটা এল যে! কী গান শুনিয়েছিলাম ওকে?"

"ওই যে – 'আয় লো, তোর খোঁপা বেঁধে দিই'!"

তিনি খুব একটু হেসে, গুনগুন করেন সুরটা। আমি শুনতে শুনতে ভাবি, আচ্ছা আমি তখন ছিলাম না কোথাও, না? নাকি ছিলাম? থাকলে, এই ঘরে তখনও কি এসেছিলাম? কি জানি। মনে পড়ে না। কত কী তো মনে পড়ে না। এক রাস্তা ধরে কত জন্ম হেঁটেছি, একই নদীতে কতবার ভেসে গেছে আমার অস্থি, একই মাটির নীচে শুয়ে থেকেছি কতবার, আর এই ঘরে আগে আসিনি? হতে পারে? স্মৃতি নাই, তাই বলে কি তা ঘটে নাই? হয়তো এসেছিলাম। উত্তরবারান্দার দরজা খুলে ঢুকেছিলাম। তখন তিনি শয্যা ছেড়ে উঠে, পশ্চিমের বারান্দায় গেছেন, গঙ্গাপ্রণাম করতে। আমি ঐ, ঐখানে বসে শুনেছিলাম সেদিনের কথা। তারপর নিশ্চয়ই আবার এসেছিলাম। বারবার। আজ আমি যেদিনের কথা তাঁকে পড়ে শোনাচ্ছি, সেইদিন কি আমিও ছিলাম? আমিই কি সেই বিশ্বম্ভর? আমারই ছোট্ট কন্যার হাত ধরে তিনি গানটি গেয়েছিলেন? আজ আমি কী আমারই আসার কথা, আমারই সন্তানের কথা, ফিরে ফিরে পড়ছি?

মায়ের মন্দিরে শঙ্খ বেজে ওঠে। ভাবনাপ্রবাহ থেকে উঠে এসে দেখি, তিনিও উঠে ধীর পায়ে এগিয়ে যাচ্ছেন ঘরের ওই প্রান্তে। দরজা খুলে পশ্চিমবারান্দায় গিয়ে দাঁড়ালেন। সন্ধ্যা হলো। গঙ্গাপ্রণামের সময়। আমি তাঁর পিছনে গিয়ে দাঁড়াই। শিবমন্দিরের পূজারী চলে গেলেন ছোট্ট প্রদীপ হাতে। 

গঙ্গাপ্রণাম করে ঠাকুর অনেকক্ষণ তাকিয়ে থাকেন নদীর দিকে। তাঁর চোখের তলায় কি কষ্ট? স্মৃতিমেদুরতার ঝঞ্ঝা বুঝি? সেদিনের কথা শুনে কি তাঁর বলরাম বসুর কথা মনে পড়ছে? সেইদিন গিরিশ বাবুও ছিলেন, সন্ধে করে এসেছিল নরেন্দ্র আর ভবনাথ। আজ তাঁদের আবার দেখতে ইচ্ছে করছে, সেইদিনের কথা শুনে? তাঁর চোখের কোলে বুঝি জল?

কই, তিনি তো কাঁদছেন না। ওই তো, তিনি আমার দিকে তাকিয়ে সন্ধ্যার মতো, জাগরণের মতো হাসেন। মাথায় একবার হাত বুলিয়ে দেন। আমার দুই গাল ভিজে যায়। আমার সমস্ত শরীর-মন কেঁপে ওঠে; তাঁকে জিজ্ঞেস করি, "সেইদিন আমি ছিলাম? আমার কথা মনে পড়ে তোমার? আমাকে দেখতে ইচ্ছে করে?"

তিনি আবারও বলেন, খুব ধীরে ধীরে – "এই যে দেখছি। এই তো তুই।"

আমি অবুঝের মতো বলে চলি, "না, এ আমি নই। এটা কোনোমতে আমি না।"

Comments