গিরিশ চন্দ্র ঘোষের দহন
দীর্ঘ লেখা। উৎসাহী যাঁরা, একটু ধৈর্য ধরে পড়লে আশা করি ভালো লাগবে।
*****
বঙ্গীয় রঙ্গমঞ্চের প্রবাদপ্রতিম ব্যক্তিত্ব গিরিশ চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের যোগাযোগ, এবং পরবর্তীতে যে সুদৃঢ় বন্ধন, তা নিয়ে জানতে, পড়তে ও সর্বোপরি ভাবতে আমার ভারি ভালো লাগে। ঠাকুরের ভাবধারার ব্যাপক প্রচারে সন্ন্যাসীদের মধ্যে সর্বপ্রথম যেমন স্বামী বিবেকানন্দ ও স্বামী ব্রহ্মানন্দের নাম আসে, তেমনই গৃহীদের মধ্যে আসেন শ্রীম এবং গিরিশ চন্দ্র ঘোষ। তারও মধ্যে, গিরিশ ঘোষের উপস্থিতি আমার বিশেষ প্রিয় হয়তো এই কারণেই – তৎকালীন (এবং আজকেও) বাঙালি সভ্য সমাজে যা-যা কিছুকে একেবারে হাঁ-হাঁ করে পরিত্যাজ্য চরিত্রদোষ বলে দেখা হতো, ক্ষণজন্মা হওয়ার পাশাপাশি গিরিশবাবু জীবনের একসময়ে ছিলেন সেই সব দোষের ভস্ম-মাখা ভৈরব।
ভদ্রসমাজে রগচটা, দাম্ভিক, কুসঙ্গ করা, মদ্যপ জিনিয়াস গিরিশবাবুকে তাঁর সবটুকু সমেত কাছে টেনে নিয়েছিলেন ঠাকুর। শুধুই কি কাছে টেনে নিয়েছিলেন? সংসারে তখন ঘোরতর মজে থাকা গিরিশের পক্ষে আত্মানুসন্ধান যে সহজ পথ নয়, তা বোঝাতে ঠাকুর একবার একটি উপমা ব্যবহার করেছিলেন – 'রসুন-গোলা বাটি। যতই ধোও না কেন, রসুনের গন্ধ যাবে না।' অভিমানী গিরিশ বলেছিলেন, 'একেবারেই কি যাবে না?' আশ্বাস এসেছিল, 'যাবে, যদি আগুনে পুড়িয়ে নেওয়া যায়।' উত্তরজীবনে 'বহু বাসনায় প্রাণপণে' চাওয়া গিরিশকে কতবারই না বঞ্চিত করে 'বাঁচিয়েছেন' ঠাকুর! 'অতি-ইচ্ছা' আর 'আধা-ইচ্ছা'র সংকট থেকে গিরিশকে বাঁচিয়েছেন তিনি। এই আঘাত সহ্য করে থাকা, অপ্রাপ্তির মোড় ঘুরিয়ে দেওয়ার ধক – এ কী কম দহন? যেইদিন এগারোজন শিষ্যকে সন্ন্যাসধর্মে দীক্ষিত করে বস্ত্রদান-অন্তে বারোতম গৈরিক বস্ত্রটি ঠাকুর দিয়েছিলেন গিরিশ ঘোষকে, সেইদিন বুঝি 'রসুন-গোলা বাটি'র সবটুকু গন্ধ আগুনে পুড়ে কেবলই বৈরাগ্যে আর প্রেমে দীক্ষিত হয়েছিলেন গিরিশ চন্দ্র ঘোষ। 'সংসারে সন্ন্যাসী লোকটা কিছুটা নির্ভীকই।'
গিরিশ বাবুর এই পথ-চলা আমার কাছে আরও রুদ্ধশ্বাস, কারণ সাবেকী আস্তিক তিনি ছিলেন না। ঈশ্বরের সঙ্গে লেনদেনের সম্পর্কে নিজেকে বেঁধে, পরমহংসদেবের পায়ে নিজেকে বিলিয়ে দিতে গিরিশ আসেন নি প্রথমে। মানুষটির একটি বিবর্তন আছে – শূন্য থেকে পূর্ণে। তাঁর বিশ্বাস একদিনে আসেনি; আঘাতের পর আঘাত পেতে পেতে তিনি অবিশ্বাসী হয়েছেন, তারপর শ্রীরামকৃষ্ণের সাক্ষাৎ পেয়ে আবার ফিরেছেন বিশ্বাসে – সদর্পে। এই যাত্রাপথে গিরিশ ঘোষের সততার দার্ঢ্য অকল্পনীয়।
আগের দুটি পোস্টে গিরিশ বাবুর নিজের লেখা থেকে অংশবিশেষ তুলে জানিয়েছিলাম তাঁর সঙ্গে শ্রীরামকৃষ্ণের প্রথম সাতটি সাক্ষাতের ইতিবৃত্ত। আজ একটু ফ্ল্যাশব্যাকে ফিরে যাবো। সেই গিরিশ যে এই গিরিশ হলেন, তাঁর পথটা কেমন ছিল? কেমন আগুনে পুড়লেন তিনি? মনের ঠিক কোন অবস্থায় তিনি ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণের মুখোমুখি হলেন?
শঙ্করী প্রসাদ বসুর 'গিরিশ চন্দ্র ঘোষের অন্তর্গত ও বহির্গত জীবন' এ ক্ষেত্রে আমার সহায়ক।
*****
রসুনের বাটি আগুনে পুড়িয়ে নিতে হবে – ঠাকুরের মুখে এই উপমা শোনার বহুদিন আগে থেকে গিরিশ ঘোষ এক চিতাগ্নি-প্রতিম জীবন কাটাচ্ছেন। শ্রীগুরুকে লাভের পথে এ যেন তাঁর দহন। শঙ্করী বসু লিখছেন –
"গিরিশের চেয়ে দুর্ভাগা জীবন অল্পই সম্ভবপর। মানুষ তাঁর বাইরের উন্মত্ত ভোগের জীবনকে দেখবার কালে গভীরে সন্ধান করেনি—যদি করত দেখতে পেত, সেখানে আছে নিয়তির অন্ধকার। সংক্ষেপে বলা চলে, এই মানুষটি সর্বদাই মৃত্যুর দ্বারা পশ্চাদ্ধাবিত। পাদপ্রদীপের আলোয় উদ্ভাসিত গিরিশ—সেই তিনিই জীবন-জড়ানো কালো ছায়ার সঙ্গে অবিরাম যুদ্ধরত। গিরিশের জীবনের আলোকিত প্রহরগুলিকে যাঁরা দেখছিলেন, তাঁরা জানেন নি যে, সেগুলি কালিন্দীতে ভাসিয়ে দেওয়া প্রদীপের মতো— নিমজ্জনের আগে মরণ-হাসিতে রক্তিম।"
*****
অষ্টম গর্ভের পুত্রসন্তান পরিবারের আদরের হলেও মাতৃস্তন্য বা মাতৃস্নেহ, কোনোটিই পান নি। তাঁর মা বরাবরই অজানিত কোনও কারণে অসম্ভব রূঢ় ব্যবহারে গিরিশকে দূরে ঠেলে দিতেন। কিন্তু কারণটি গিরিশের অজানা থাকে না এক সময়ে। প্রচণ্ড জ্বরে একদিন গিরিশ আচ্ছন্ন, শুনতে পেলেন মা বাবাকে বলছেন, "যেমন করেই হোক, ওকে বাঁচাও।" গিরিশের বাবাও কিছুটা বিস্মিত হয়ে বললেন, "তুমি এত ব্যাকুল হচ্ছ!" ঘোরের মধ্যে গিরিশ শোনেন মায়ের কাতর উত্তর – ""আমি রাক্ষসী, এক সন্তান খেয়েছি [এর গিরিশচন্দ্রের জ্যেষ্ঠভ্রাতা নিত্যগোপালের মৃত্যু হয়েছিল], এটি অষ্টম গর্ভের ছেলে, পাছে আমার দৃষ্টিতে কোনো অমঙ্গল হয়, তাই আমি একে কাছে আসতে দিতুম না, এলে দূর-দূর ক'রে তাড়িয়ে দিতুম; কোলে করিনি, কখনো একটি মিষ্টি কথা বলিনি, আমার হেনস্তায় কত কষ্ট পেয়েছে, আমার বুক ফেটে যাচ্ছে।”
মায়ের গোপন স্নেহ বুঝতে পারার কয়েক মাসের মধ্যে মায়ের মৃত্যু হয়। গিরিশের বয়স তখন এগারো। তার এক বছর আগে চলে গেছেন নিত্যগোপাল (উপরে যাঁর কথা বলা হল) – যাঁর স্নেহচ্ছায়ায় গিরিশ বড় হয়ে উঠছিলেন।
পিতার স্নেহ গিরিশ পেয়েছিলেন অপরিমেয়; শাসন করা, বা ইচ্ছায় বাধা দেওয়া – কোনও কাজই তাঁর পিতা করেন নি। পিতৃস্নেহের দীপটিও নির্বাপিত হলো গিরিশের চৌদ্দ বছর বয়সে। ইতিমধ্যে তাঁর চেয়ে দু বছরের বড় বোন প্রসন্নকালীরও মৃত্যু হয় গেছে — "শৈশবে ছোট ভাইটিকে সে অত্যন্ত ভালবাসত। “গিরিশচন্দ্রকে সে আদর করিয়া 'গিরিভাই' বলিয়া ডাকিত। গিরিভাইকে একবার কোলে করিতে পারিলে তাহার আনন্দের সীমা থাকিত না। হাতে গিরিশচন্দ্রের শুইবার কাঁথা শুকাইতেছে, হঠাৎ বৃষ্টি আসিয়াছে, পাছে গিরিশ-ভাইয়ের কাঁথা ভিজিয়া যায়, বালিকা কাঁদিয়া আকুল।"
পিতৃবিয়োগের অল্প কিছুদিন পর গিরিশের বিবাহ দিলেন অভিভাবিকা বড়দিদি, সুখ ও শান্তির কামনায়। এক দেড় বছরের মধ্যে গিরিশের পঞ্চমা বোন কৃষ্ণরঙ্গিনী প্রয়াত হলেন। গিরিশের বয়স যখন তেইশ, তাঁদের প্রথম পুত্রসন্তান জন্মাল – তরুণ পিতামাতার স্বপ্নসাধ। সে ছেলে বাঁচলো কয়েক মাস। তার পরের বছর চলে গেলেন গিরিশের মেজদিদি, আর অব্যবহিত পরেই গিরিশের তৃতীয় ভাই – কানাইলাল।
এরপর বছর ছয়েক সব চুপচাপ – সুনামির আগের শান্ত সমুদ্র যেন। গিরিশ ত্রিশ বছরে পা দেওয়া মাত্র দ্বিগুণ বেগে সে ফিরে এল। সন্তান প্রসব করে স্ত্রী আক্রান্ত হলেন সূচিকায়। সন্তানটি বাঁচল না। অল্পদিনের মধ্যে চলে গেলেন গিরিশের ছোটভাই ক্ষীরোদচন্দ্র; কয়েকমাস পর তৃতীয় বোন, এবং তারও কয়েকমাস পর, গিরিশের স্ত্রী। তখন গিরিশ বাবুর বয়স ত্রিশ বছর নয় মাস।
নিজের তিরিশ বছর বয়সের তৎকালীন জীবনে ১২টি ঘনিষ্ঠ মৃত্যু দেখে ফেলা গিরিশ ঘোষের একমাত্র সখা তখন 'অন্ধকার'। ঈশ্বরকে ডাকার ইচ্ছা তিনি তখন স্বেচ্ছায় বর্জন করেছেন। তিনি তখন নাস্তিক।
গিরিশ বাবুর নাস্তিকতা কী ভয়াল মাত্রায় পৌঁছেছিল, তার একটি উদাহরণ দিয়েই শেষ করবো আজ। অবিনাশচন্দ্র গঙ্গোপাধ্যায়ের লেখা 'গিরিশচন্দ্র' নাম্নী জীবনী থেকেই একটি ছোট্ট অংশ তুলে দিই আপনাদের সামনে –
"শারদীয়া পূজার পূর্বদিন প্রভাতে বাটার লোক উঠিয়া দেখিল বহির্বাটীর প্রাঙ্গণে কাহারা প্রতিমা ফেলিয়া দিয়া গিয়াছে। বাড়িতে হুলস্থুল পড়িয়া গেল। ... বাটীতে বহু লোকের সমাগমে একটা কোলাহল উত্থিত হওয়ায় গিরিশচন্দ্র ঘুম হইতে উঠিয়া পড়িলেন। বহির্বাটীতে আসিয়া প্রতিমাদর্শনে বুঝিলেন—পাড়ার জনকতক দুষ্ট লোকের কীর্তি। তিনিও তাহাদের কীর্তি লোপ করিবার জন্য কালাপাহাড়-মূর্তি ধারণ করিলেন। মদ্যপান করিয়া, কোথা হইতে একখানি কুঠার সংগ্রহ করিয়া আনিয়া প্রতিমা খণ্ড-বিখণ্ড করিতে আরম্ভ করিলেন। ... বাড়িতে কান্না পড়িয়া গেল। ...[কিন্তু] তাঁহার সেই সংহারমূর্তি দর্শনে অন্য কেহ নিকটে যাইতে সাহস করিল না, একে-একে সকলেই সরিয়া পড়িল। ধ্বংসকার্য শেষ করিয়া গিরিশচন্দ্র প্রতিমার এক-এক টুকরো তাঁহাদের খিড়কির বাগানের এক আমগাছতলায় লইয়া গিয়া স্তূপীকৃত করিলেন। পরে সমস্ত দিন ধরিয়া সেইগুলি মাটিতে পুঁতিয়া তবে নিশ্চিন্ত হইলেন।"
আমরা মনে করতে পারি – যে হাতে গিরিশ কুঠার তুলে নিয়ে প্রতিমাকে খণ্ড-বিখণ্ড করে গোর দিয়েছিলেন, সেই হাতেই ১৮৮৫ সালে শ্যামপুকুর বাটীতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণকে কালীজ্ঞানে পুষ্পাঞ্জলি দিয়ে পূজা করেছিলেন গিরিশ।
এ যেন ষোলো কলার আক্ষরিক পূর্ণ হওয়া – coming a full circle! মহামায়া তাঁকে জীবনের, বিশ্বাসের দুই মেরুতেই অধিষ্ঠান করিয়েছিলেন।
*****
কুঠারাঘাতের ঘটনার কিছু বছরের মধ্যেই গিরিশ চন্দ্র ঘোষের সঙ্গে দেখা হয় ঠাকুরের। সেইসব সাক্ষাতের কথা আগেই বলেছি। সাক্ষাৎ-পরবর্তী ঘটনাবলী আবার অন্যদিন বলা যাবে।
Comments
Post a Comment