ব্রহ্মানন্দ ভবনে একদিন, প্রার্থনায়

২০/০৭/২০২৩

আজ সন্ধেয় ব্রহ্মানন্দ ভবনের ঠাকুরঘরে ঢুকে, ভিড়ের পিছনে, শেষ দরজার কাছে চুপটি করে বসেছিলাম খানিকক্ষণ। প্রার্থনা মাঝপথ পেরিয়েছে – আমার সামনে কিছু ধুতি পরা মূর্তিমানেরা নিজেদের মধ্যে খুনসুটি করছে, একে অন্যকে ঠেলা দিচ্ছে। হাসির দমকে তাদের শরীর কাঁপছে। যেভাবে কাঁপছে ঘরের ওইদিকে জানলার পর্দাগুলি, তিরতির করে।

প্রার্থনা শেষ। একটি ছেলে 'শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তমালিকা' থেকে পাঠ করছে। ছেলেটির কন্ঠস্বর ভারি সুন্দর – গম্ভীর, অথচ তীক্ষ্ণ। তার মুখ দেখতে পাচ্ছি না এত দূর থেকে। স্বামী বিবেকানন্দের কথা পড়ছে সে। হঠাৎ উত্তরের সেই জানলাগুলির পর্দারা ঝাপটা দিয়ে উঠলো, সাভানা বনভূমিতে সিংহের কেশর উড়ছে যেন। ওপারে নীলকন্ঠ আকাশ।

নরেন্দ্রপুরে প্রার্থনাঘরের এই জানলাগুলিতে বাতাসের হাজিরা বাদ যায় না, না? সতেরো বছর আগে এমনই জুলাই মাসে গিয়ে হাজির হয়েছিলাম সেখানে। তখনও এক একদিন বিকেলে দেখতাম, জানলার ছোট ছোট পর্দাগুলির বিদ্রোহে ঝলমলে রোদ আর আষাঢ়ে বৃষ্টিছাঁট একসঙ্গে এসে ঢুকছে ঠাকুরঘরে। আমার তখন ঠাকুরের কথা, মায়ের কথা মনে পড়তো না। ইস্কুলের বন্ধুদের কথা মনে পড়তো।

ছেলেটি 'ভক্তমালিকা' পাঠ শেষ করলো। প্রার্থনাঘরের সব আলো নিভিয়ে দেওয়া হলো। কেবল ঠাকুর বসে আছেন যে আসনে, তার উপরের হালকা আলোটি জ্বলছে। ধ্যানের সময়। খুনসুটিকারীরা শান্ত – গল্প করতে যে গানের আড়াল প্রয়োজন, তা এখন আর নেই। সারা ঘর শান্ত, নীরব, অন্ধকার। বাইরে আকাশের নীল আরও গাঢ়। আলোকিত কেবল ঠাকুরের ধ্যানস্থ, কোমল সেই ছবিখানি, ঘরের ভিতর। 

তিনি দেখছেন আমাদের – তাঁর সন্তানদের। উত্তরের জানালায় পর্দা তখনও বেসামাল – বাতাস ঢুকে কাঁপিয়ে দিচ্ছে ঠাকুরের আসনঘেরা কাপড়খানি। ছায়া পড়ছে তাঁর মুখে। সন্তানদের নিয়ে চিন্তান্বিত, বড় মায়াময় সেই মুখখানি।

Comments