অগ্নিমন্ত্র
যে সন্ন্যাসে ও পরার্থপরতায় ভারতকে দীক্ষিত করতে চেয়েছিলেন স্বামী বিবেকানন্দ, বহু ক্ষেত্রে সেই চেতনার সঙ্গে খুব মিলে যায় তৎকালীন সংগ্রামী, বিপ্লবীদের ত্যাগের অগ্নিমন্ত্র।
উৎপল দত্তের 'জালিয়ানওয়ালাবাগ' নাটকে সইফুদ্দিন কিচলু তাঁর নিজে হাতে গড়া বিপ্লবী রেশমাকে যে কাজে নিযুক্ত করেন, তা হলো ঘরবাড়ি ছেড়ে ব্রিটিশ অফিসার টমসনের কণ্ঠলগ্না হয়ে, প্রয়োজনে তার রক্ষিতা হয়ে সেই বাড়িতে প্রতিনিয়ত হয়ে চলে সমস্ত ভারত-বিরোধী মিটিং, অবদমনের ব্লু-প্রিন্টের খবর তাঁর সশস্ত্র বিপ্লবী বন্ধুদের কাছে পাচার করা। অত্যন্ত গোপনীয় এ কাজ, তাই রেশমা কেন ঘর ছাড়ছে – বলতে পারবে না তাঁর স্বামীকেও। কিচলু বলেন, "প্রয়োজনে ঝগড়া করো, মুখের উপর বলো এই সংসারের দারিদ্র্য তোমার সহ্য হচ্ছে না, তুমি নিজের দেহ বেচে সুখে থাকতে চাও। বলো এই কথা।" শোকে বিহ্বল রেশমা বলছেন, "এ কথা চন্দ্রকে (স্বামী) বলি কী করে? দরিদ্র বাড়িতে সে রোজ আমার জন্য রাতে দুটো রুটি নিয়ে ফেরে কারখানা থেকে ফেরার পথে। সে নিজে খেতে না পাক, আমার খাবার আনতে ভোলে না। তাঁকে দারিদ্র্য নিয়ে খোঁটা দেবো? গোপনীয়তা রক্ষা করতে তাঁকে বলবো, আমি শরীর বেচতে যাচ্ছি? সে তো সত্যিই আমায় পতিতা ভাববে, কলঙ্কিত হবে। আমার সংসার যে ভেঙে যাবে।" কিচলুর উত্তর, "একটা দেশের জন্য একটা সংসার না হয় ভাঙলই, রেশমা।" আমরা হতবাক হয়ে দেখি, রেশমা শেষ অব্দি তাইই করে – সদর্পে।
এই নাটকেরই আরেক চরিত্র মহিন্দর কউর। তাঁর স্বামী ইংরেজ রেজিমেন্টের বিশ্বস্ত সুবেদার, তাঁর ছেলেরা বন্দুক ও বোমা তুলে নিয়েছে ব্রিটিশদের বিরুদ্ধে। ছেলের গ্রেপ্তার ও মৃত্যুদণ্ড আসন্ন, মা চোখের জল মুছে বড় ছেলেকে বলেন, "মরতে হলে মরবি দু ভাই মিলে। ওই দেশ-মায়ের কাছে যাবি, দেশ-মায়ের মাটিতে যাবি। ওই মা তোদের এই মায়ের চেয়ে অনেক বড়। এই মায়ের হয়তো একটু অভিমান হবে, কষ্ট হবে। কিন্তু আজ তোরা দেশ-মায়ের কাছে গেলে পরে আমার মতন কত মা তাঁদের ছেলেদের সারাজীবন কাছে পাবে।"
এই ত্যাগ, এই choice between Good and Greater Good – আজকের দিনে, আমাদের কাছে অবাস্তব ঠেকে। প্রায় হাস্যকর। কিন্তু এরকম কাহিনীর, এমন ইতিহাসের কি অভাব আছে? আমরা আজ দূরে সরে গেছি, আমরা 'দান' করলেও সে 'দয়া' করা হয়ে যায়, তা বলে কি এইসব ইতিহাস কোনোদিন ছিল না?
১৮৯৭ সালে স্বামী বিবেকানন্দ আগামী পঞ্চাশ বছরে ভারতবাসীর যা কাজ, তার কথা বলেছিলেন। নীচের ছবির লেখাটিই সেই কথা। এমন কথা কত মহিন্দর কউর তাঁর ছেলেকে শেষ দেখা দেখতে দেখতে বলেছেন! কত মানুষ গেরুয়াধারণ না করেও এই প্রবল সন্ন্যাসের আগুনে পুড়ে ছাই হয়ে গেছেন, সোনা হবার বাসনাটুকু না রেখে।
Comments
Post a Comment