'চক্ষুতে জল আসিয়াছে'...

১১ই মার্চ, সন ১৮৮২। সে বছরে দোলযাত্রার দিন সাতেক পরের এই তারিখটি কথামৃতে খুব গুরুত্বপূর্ণ। অত্যন্ত স্বাভাবিক, পরিচিত ঘটনা – বলরাম বসুর বাড়িতে ঠাকুর শ্রীরামকৃষ্ণ ভক্তসঙ্গে আনন্দ করছেন, গান গাইছেন। এমন ঘটনার মাঝে প্রায় চোখ-এড়িয়ে যাওয়া আর একটি ঘটনা-কণিকা, তার তস্য-সামান্য বিবরণ। ঠাকুর একটি গান গাইছেন –

"দেখে এলাম এক নবীন রাখাল,
নবীন তরুর ডাল ধরে,
নবীন বৎস কোলে করে,
বলে, কোথা রে ভাই কানাই।
আবার কা বই কানাই বেরোয় না রে,
বলে কোথা রে ভাই,
আর নয়ন-জলে ভেসে যায়।"

গানটির শেষে, যেন ইতস্ততঃ করে, কারো চোখে না পড়ার আর্তি নিয়ে ছোট্ট একটি বাক্য, বিবরণ – "ঠাকুরের প্রেমমাখা গান শুনিয়া মাস্টারের চক্ষুতে জল আসিয়াছে।" এইটুকু। আর কোনোরকম কথার অবকাশ না রেখে, ঝপ করে সন্ধ্যা নামার মতো ফুরিয়ে যায় শ্রীশ্রীরামকৃষ্ণ কথামৃতের দশম পরিচ্ছেদ; দাঁড়ি পড়ে মাস্টারমশাইয়ের সঙ্গে ঠাকুরের দেখা হওয়ার প্রথম মাসে। পরের পাতা থেকে এপ্রিল, ১৮৮২।

কথামৃতের পাঠকদের কাছে ঠাকুরের গানে, প্রার্থনায় ভক্তদের, শিষ্যদের অশ্রুসিক্ত নয়নের দৃশ্য নতুন নয়। তবু, এই আপাত ছোট্ট ঘটনাটি, এক লাইনের বর্ণনাটি কেন ভিন্ন সুরে বাজে? কোথায় তার মাহাত্ম্য? কেন সে বিশেষ? কারণ, ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হওয়ার পর এই প্রথম মাস্টারমশাইয়ের চোখে জল এল। এই প্রথম মানুষটি একেবারে নগ্ন হলেন। এই প্রথম, সজ্ঞানে তিনি যেন তাঁর শিক্ষা, মান, সবকিছুর খোল ভেঙে বেরিয়ে আসতে ইচ্ছা করলেন। অহংকার তাঁর আগেও ভেঙেছে, দ্বিতীয় দর্শনের সন্ধ্যায়। মুগ্ধতা আগেও এসেছে। কিন্তু ১১ই মার্চ, ১৮৮২ তারিখে তাঁর মনটি ঠাকুরের হাতের একতাল মাটিতে পরিণত হলো। আজ এল সম্পূর্ণ শরণাগতি; আজ তিনি সত্যই সমর্পিত।

তাঁর কথায়, গানে, হাসিতে, এমনকি তাঁর নীরব উপস্থিতিতে, এমনকি তিনি উপস্থিত ছিলেন – এই স্মৃতিতে চোখে জল আসাই শ্রীরামকৃষ্ণের ভাবে দীক্ষিত হওয়ার প্রথম ও মূল ধাপ, বোধ করি। তাঁর কাছে যাওয়ার পথ হয়তো এরকমই। ঔদাসীন্য, কৌতূহল, উৎসাহ, দ্বিধা, জিজ্ঞাসা, সমর্পণ। ঘরের চৌকাঠ থেকে তাঁর হৃদয় অবধি যাওয়ার ছটি পা। কথামৃতের ওই চার বছরে কত, কত মানুষ এই ছটি পা এগিয়ে এসেছেন; কত মানুষ দু পা এগোলে ঠাকুর নিজে এগিয়ে এসেছেন চার পা; কত মানুষ তিন পা এগিয়ে কী ভেবে যেন পিছিয়ে গেছেন। সেই চার বছরের কথা শেষ নব্বই বছর ধরে কত সহস্র মানুষ পড়েছেন, এবং পা বাড়িয়েছেন। ছটি পায়ের শেষে তাঁর চোখদুটি।

অমন চোখ দেখিনি আর। কত চিত্রশিল্পী আঁকলেন তাঁকে, তাঁর ধ্যানস্থ ছবিটি দেখে। পুঙ্খানুপুঙ্খ। তবু, তিনি কই তাতে? সেই ধ্যান কি কেবল তাঁর চোখে আছে? ধ্যান চোখ পেরিয়ে ছড়িয়ে পড়েছে তাঁর ঈষৎ বঙ্কিম ভুরুতে, স্বল্প খুলে থাকা দুটি ঠোঁটের মাঝে সেই ধ্যান, দুটি হাতের বৃদ্ধাঙ্গুলি একে অপরকে ছুঁয়েছে যেখানে, সেখানে সেই ধ্যান। 

সেই ধ্যান দর্শন, স্পর্শনের পথের এক বিরাট উপাখ্যান ১১ই মার্চ, ১৮৮২ সনের একটি বাক্য। "ঠাকুরের প্রেমমাখা গান শুনিয়া মাস্টারের চক্ষুতে জল আসিয়াছে।"

Comments