কথামৃতের শেষ ক পাতা

কথামৃত শেষ হয়ে আসছে। দেওয়াল থেকে গৌর নিতাইয়ের ছবিটি খুলে হাতে তুলে নেন রামলাল – "তাহলে, ছবিখানা এঁকেই (মাস্টারকে) দিলাম।"
শ্রীরামকৃষ্ণ – আচ্ছা; তা বেশ।

মহেন্দ্র সরকার – কলকাতার ডাকসাইটে ডাক্তার – এসে ঘন্টার পর ঘন্টা বসে থাকেন রোগীর সামনে। অবতার তিনি মানেন না; ভক্তেরা প্রভুকে ভূমিষ্ঠ হয়ে প্রণাম করে দেখলে বলেন, "ভালো লোকটার মাথা খেও না!"; মাঝেসাঝে ধমকেও ওঠেন, "তুমিও বেশ বসে বসে পরমহংসগিরি ফলাচ্ছ!" তবু তাঁর আলাপ থামে না পরমহংসের সঙ্গে; অন্য 'কল'-এ যেতে দেরী হয়ে যায়। এসে চটজলদি রোগ ও পথ্যের প্রসঙ্গ সেরে জীবনের আলোচনা শুরু হয়। তর্ক হয়, তুমুল তর্ক – একদিকে ডাক্তার, অন্যদিকে নরেন্দ্র আর গিরিশ। ঠাকুর এক-আধবার জিজ্ঞেস করেন, "আমার এইসব (ভাবকে) কি ঢঙ বলে বোধ হয় গো?" ডাক্তার বলেন, "তুমি কি বুঝছো না, মনের ভাব? কত কষ্ট করে তোমাকে এখানে দেখতে আসছি।" শীতের রৌদ্রের মতো অভিমান ঝরে পড়ে তাঁর কণ্ঠে, "আজ থেকে সবার সঙ্গে কথাবার্তা তোমার একদম বন্ধ। অসুখ বাড়বে।" একটু থেমে ডাক্তার বলেন, "কেবল আমি এলে একটু কথা বলবে।" তাঁর অবাধ্য রোগী বলেন, "মহীন্দ্র বাবু, তুমি রোসবে।" মাস্টারমশাই কেবল আলগা করে '(সহাস্যে)' কথাটুকু লিখে দেন। ডাক্তারের নীরব হয়ে বসে থাকেন, চতুর্থ খণ্ড শেষ হয়ে যায়।

'সহাস্যে' আর 'সকলের হাস্য'-র মাঝেই তবু ঘনিয়ে আসে সংবরণ। এমনই বসন্তকালে, ১৮৮৫ সনে শ্রীম লিখেছিলেন 'সন্ধ্যাসমাগমে' – "সিন্ধুবক্ষে যথায় অনন্তের নীল ছায়া পড়িয়াছে, নিবিড় অরণ্যমধ্যে, অম্বরস্পর্শী পর্বত শিখরে, বায়ুবিকম্পিত নদীর তীরে, দিগন্তব্যাপী প্রান্তরমধ্যে, ক্ষুদ্র মানবের সহজেই ভাবান্তর হইল। এই সূর্য চরাচর বিশ্বকে আলোকিত করিতেছিলেন, কোথায় গেলেন? ... সন্ধ্যা হইল। কি আশ্চর্য! কে এরূপ করিল? – পাখিরা পাদপশাখা আশ্রয় করিয়া রব করিতেছে। মানুষের মধ্যে যাঁহাদের চৈতন্য হইয়াছে, তাঁহারাও সেই আদিকবি কারণের কারণ পুরুষোত্তমের নাম করিতেছেন।" ঠিক একবছরে উথাল-পাথাল বদলে গেছে অনেককিছু। সংবরণ যেন ঠাকুরের নয়, তাঁর ভক্ত সেবকদের। এতদিনের সাজো-সাজো রব, গান, ঈশ্বরপ্রসঙ্গ, বা নিছকই আদর-ভালোবাসার খেলা পেরিয়ে আজ কাশীপুর উদ্যানে তাঁরা ম্লান, দিশেহারা, তবু বেঁধে-বেঁধে থাকা একদল মানুষ। এক বছর পেরিয়ে শ্রীম ১৮৮৬ সনের বসন্তে লিখছেন, "রাত্রি দুই প্রহর। আজ শুক্লপক্ষের নবমী তিথি, চাঁদের আলোয় উদ্যানভূমি যেন আনন্দময় হইয়া রহিয়াছে। ঠাকুরের কঠিন পীড়া, – চন্দ্রের বিমলকিরণ দর্শনে ভক্তহৃদয়ে আনন্দ নাই। যেমন একটি নগরীর মধ্যে সকলই সুন্দর, কিন্তু শত্রুসৈন্য অবরোধ করিয়াছে। চতুর্দিক নিস্তব্ধ, কেবল বসন্তানিলস্পর্শে বৃক্ষপত্রের শব্দ হইতেছে।"

দমকে দমকে, খড়খড়ে রোদে একে একে ঝরে যাচ্ছে কথামৃতের একটি করে পাতা। আর যাঁকে ঘিরে এতকিছু, যাঁর নাকি 'লীলা সংবরণ', তিনি কী করছেন? কথা দিয়েছিলেন, কথা রাখছেন – প্রেমভাণ্ড হাটে ভাঙছেন, যত এগিয়ে আসছে দিন। সিন্ধুনদের পার থেকে তাঁকে দেখতে এসেছে হীরানন্দ, নতুন বছরে। তাঁর পাতের ভাতগুলি আজ একটু চাল-চাল, সে নিয়ে এই মানুষটির কী কষ্ট! গিরিশ – তাঁর আদরের, প্রশ্রয়ের সন্তান – এসে বসলে এখনও আনাচ্ছেন ফাগুর দোকানের কচুরি। বহুদিন চলচ্ছক্তিহীন; তবু শয্যা থেকে নেমে এগিয়ে, জল গড়িয়ে দিচ্ছেন গিরিশের হাতে। নরেন্দ্র সংসারের দাবদাহে ক্ষতবিক্ষত হয়ে কদিন পর এলে মুখ দেখেই বলছেন, "কেঁদেছিস, না?" মাস্টারমশাইয়ের উন্মাদপ্রায় স্ত্রীকে ক'দিন কাটিয়ে যেতে বলছেন কাশীপুরের এই বাড়িতে। মনে শান্তি আসবে। 

কথামৃত শেষ হয় ১৮৮৬ সনের ২৪শে এপ্রিল। এর পরেও আরও ১১৩ দিন সশরীরে ছিলেন শ্রীরামকৃষ্ণ। অসহ্য যন্ত্রণা নিয়ে, বাকশক্তি হারাতে হারাতে, জীর্ণ কঙ্কালসার হতে হতে তিনি ছিলেন – সস্নেহে, সহাস্যে। যত কাছে এসেছে চলে যাওয়া, তত রোখ বেড়েছে তাঁর উচ্চারণে – "একবার আন্তরিক যে ডেকেছে, তাকে এখানে আসতে হবে। আসতেই হবে।"

বইটিতে লিপিবদ্ধ শ্রীরামকৃষ্ণের শেষ উচ্চারণ, "তুমি আসবে", আর শেষ ইঙ্গিত "তাকেও আনবে"। কার উদ্দেশ্যে এ কথা? কাকে আনার কথা? কোথায়? দিন-তারিখ মেলালে এ-কথার নির্দিষ্ট প্রসঙ্গ আছে। কিন্তু কথামৃতের মতো এমন divinely romantic literature-এর সূত্রে সে প্রসঙ্গ পেরিয়ে প্রতীকেই যেতে ইচ্ছে করে। ঠাকুরের বেশির ভাগ ভক্তই এসেছিলেন কারো না কারো সঙ্গে। যাঁরা এনেছিলেন, তাঁরা অনেকে স্মৃতির অতলে হারিয়ে গেছেন; যাঁরা এসেছিলেন, তাঁরাই অনেকে আজ পরিচিত। কিন্তু আনা, আর আসা – এই দুটি কাজই থাকে, এমন মানুষের কাছে, ভাবের কাছে, সাহিত্যের কাছে। হয়তো শ্রীম ঠাকুরের কণ্ঠে আগামীর জন্য এই অপ্রতিম উচ্চারণটিই রাখতে চেয়েছিলেন সবার শেষে – "তাকেও আনবে।" চক্রাকারে ঘুরতে থাকে আসা, আর আনা।

কথামৃত শেষ হয়েও শেষ হয় না।

Comments