অহংকার
তোমার দরজার চৌকাঠে দাঁড়িয়ে থাকে শোকাতুরা ব্রাহ্মণী। তার মেয়ের বিয়ে হয়েছিল বড় বাড়িতে; যখন দেখা করতে আসতো মাঝেসাঝে, সঙ্গে আসতো কত লোকলস্কর। ব্রাহ্মণীর গর্ব আর ধরতো না। সেই মেয়ে, আজ কিছুদিন হলো, মায়ের কাছে আসা-যাওয়ার মায়া কাটিয়ে চলে গেছে ও' পারে। তাই, শোকাতুরা ব্রাহ্মণী জড়বৎ দাঁড়িয়ে তোমার দরজায় – সে এই দরজায় ফিরে ফিরে আসে, যদি তুমি কথার আলম্ব দাও। ঘরময় লোক, তার বসার জায়গা হয়নি। সে ওই দূরে দাঁড়িয়েই শোনে কিছুটা ঘোরের মধ্যে, তুমি বলছো, "একমাত্র বাজিকর সত্য। আর কিছু নয়। যে থালায় কাপড় ফেলে সে বলছে, 'লাগ লাগ লাগ!', সে কাপড় সরিয়ে নিলে কয়েকটা পাখি ঝটপটিয়ে আকাশে উড়ে যায় কেবল।" ব্রাহ্মণীর দুই চোখ জলে ভরে আসে আবার, মেয়েটার কথা মনে পড়ে। সেও বুঝি ঝটপটিয়ে উড়ে গেছে দূরে। "অনন্ত মহাসমুদ্রে আমরা ভুড়ভুড়ি বই কিস্যু নই। জলেই জন্ম, জলেই লয়।" দুপুর গড়ালো; লোকজন উঠি উঠি করছে। সেই ব্রাহ্মণীও বললো এবার, "আমি তবে আসি আজ।"
তুমি জানলা দিয়ে বাইরে কী যেন দেখো, দেখে বলো "তুমি চলে যাবে? এখন যাবে? বাইরে বড় রোদ। একটু বোসো না; বেলা পড়লে যেও।"
মাস্টারের স্ত্রীও পুত্রশোকে উন্মাদিনী। জীবন অসংলগ্ন তাঁর, কোন মুহূর্তে কোন দিকে বইবে জানা নেই। গরমকাল, বাড়ির উপরতলায় থেকে অসুস্থতা বাড়ে। আত্মহত্যার প্রবণতাও আসছে ক্রমে। তুমি মাস্টারকে কাছে ডেকে একদিন বলেছিলে, "উপরে থাকতে দিও না গো, গরম তো। আর রান্না করার ভারও যেন না নেয়। সাবধানে রেখো।" মাস্টারের সঙ্গে এক একদিন সে এসে চুপটি করে বসে থাকে তোমার ঘরের এক কোণে। তুমি কথা বলো সকলের সঙ্গে, গান করো। তার কানে পৌঁছয় কি পৌঁছয় না, কিন্তু – সে আশ্চর্যভাবে কিছুটা শান্ত হয়ে থাকে। মনের ঘা হয়ে যাওয়া গায়ে যেন কিসের প্রলেপ পড়ে। সে বসে থাকে। ভাবে, কলকাতার বাসা ছেড়ে এই দক্ষিণেশ্বরে কয়দিন থাকি যদি? বাঁচার পথ পাবো আবার?
সে কথাও তোমার অজানা থাকে না। একদিন নিজেই ডেকে বলো, "থাকবে এখানে কদিন? থাকো না ওই নহবতে ... নিশ্চিন্তে থাকো। তোমায় নিয়ে আমার ভয় হয় বাপু, গঙ্গা আছে তো কাছে। ওইদিকে যাবে না তো তুমি, বলো?"
তোমার এত শত বাণী, গল্প, গান মনে থাকে না আমার। দ্বৈত না অদ্বৈত, তন্ত্র না বৈষ্ণব, ইসলাম না খ্রিস্টান – আমি বুঝি না। আমি শুধু শুনি তোমার সকরুণ, স্নেহমাখা কথাগুলি – "এখন বড় রোদ; একটু জিরিয়ে আরও পরে যাও।" মনে অনুরণন তোলে তোমার আশা-আশঙ্কার সেই ধ্বনি, "তোমায় নিয়ে আমার বড় ভয়। ওইদিকে যাবে না তো, বলো?"
তোমার কথায়, হাসিতে, আশঙ্কায়, স্নেহে, করুণায় এমন ধন রাখা আছে – সেই ধন কি কোনও ঈশ্বরের থেকে পেতাম কোনোদিন? পাবো? নিজে শরীরভাঙা সাধনা করে পেলে সাত রাজার ধন এক মানিক, তবু তোমার সিদ্ধান্ত তাকে ছেড়ে এই সুখদুঃখে ঠোক্কর খাওয়া, অসমর্থ, অসহায়, দরিদ্র হৃদয়গুলির কাছে থাকা। নিজেকে নিঃশেষিত করা, শুধু তাদেরকে এই আনন্দনদীর এক আঁজলা জল পান করাতে।
এই রুখোসুখো পৃথিবীতে কেউ কারো খোঁজ নেয় না গো। তার মধ্যে তোমার আদর আর আশঙ্কাগুলিই দৈব মনে হয়। তুমি আমাদের জন্য আমাদেরই মতো বাঁচো, এটুকুই তো আশ্বাস, বরাভয়। তাই, তোমার কথা শুনলে যে আনন্দ, তাতে কান্নাও অকৃপণ হয়। বেলুড় মঠের সিঁড়িতে পূর্ণিমার বান যেভাবে এসে ভাঙে, ওইভাবে কান্না আসে। ওইটুকু যেন আসে, এইমতো কোরো। তোমার প্রেম অশ্রু দিয়ে ধারণ করতে পারি, এই অহংকারটুকু যেন আমার কোনোদিন খর্ব না হয়।
Comments
Post a Comment