চন্দনবর্ণ
চন্দনের গন্ধ। কড়া। চন্দন ধুপের গন্ধ কি? না, এতে ধোঁয়ার গন্ধ মিশে নেই। পাথরের শিলে ঘষা থকথকে চন্দনের গন্ধ। হয়তো পাথরবাটিতে জমাট করে রাখা; হয়তো শিলের গায়ে শুকিয়ে আছে; হয়তো জল-গড়ানোর ঘটিতে চন্দনমাখা আঙুলের ছাপ। তামার বিরাট থালে রাখা রক্তগাঁদা, স্বর্ণচাঁপা, বেলি, টগরের গায়ে সেই চন্দন বর্ণ হয়ে চর্চিত।
কিন্তু আমি এই সবের থেকে অনেক দূরে, চোখ বুজে আছি। একবার চোখ মেলে দেখি, বাইরে বিকেল হয়েছে। ঝোপড়া কাগজফুলের গাছে সাদা আর গোলাপি হুহু করছে বাতাসে। কল্কে ফলের গা থেকে চুঁইয়ে পড়ছে মাকড়সার জাল, রোদে চিকচিক করছে। পাশের বারান্দায় শালিকের সংসারধর্মে বিরক্ত হয়ে আমার পাশে বসা মানুষটি বললেন, "এত্ত হল্লা করে না এরা!"
চোখ বুজি। কাগজফুল কেমনভাবে কাঁপছে, আর দেখতে পাই না। মাকড়সাটি তার জালের অন্য মাথাটি কোথায় রাখলো কে জানে। শালিকের ডাক মিশে যায় অনাহতে। কড়া চন্দনের গন্ধ আসে আমার নাকে। প্রাণপণ শ্বাস নিই; সেই গন্ধ আমার তেতো-হয়ে-থাকা গলা দিয়ে বুকে নামে।
বুকের ঠিক মাঝে কী থাকে, জানি না। হৃৎপিণ্ড একটু বাম দিক ঘেঁষে। কিন্তু একদম মাঝখানে হাত রাখলে, পাঁজরার মাঝের হাড়টুকু বোঝা যায়। ওটুকুই। হয়তো বুকের মাঝে কিছুই থাকে না কারো কোনোদিন। তবু, সেই মধ্যিখানের শূন্য যেন আঁচড়ানো, এবড়ো খেবড়ো, ঘেয়ো। চন্দনের গন্ধে আঁচড়ের দাগগুলি যেন একটু একটু মেলায়। চোখ আমি খুলতে চাই না; চন্দনের গন্ধ হারিয়ে যাবে, হারিয়ে যাবে উপশম।
চোখ বুজে তোমায় ভাবি। মনে হয়, তোমার অঙ্গ আমার এই শরীরে চন্দন হয়েছে আজ।
তোমার স্বর শুনি। চন্দনবর্ণ সেই স্বর শুনে মা বলে ডাকি। কাগজফুলের হুহু ভেসে যাওয়া, শালিকের ডাক, ঘাটের নবম সিঁড়িতে গঙ্গার ছলছল, সবার স্থান আছে তোমার সেই স্বরে। কেবল এই আমরা – ছোট ছোট মানুষের দল যারা বোধ পেয়েও বিস্মৃত হই, এত তাপ-গ্লানি শেষে তোমায় যারা আশ্রয় করে আবার জরায় ভুলে যাই, যারা নিরাময় ছাড়তে পারি, তবু শোককে কদাচ নয় – সেই আমাদের কী হবে, ঠাকুর?
Comments
Post a Comment