যে তোমায় যে নামে ডাকে
ত্রিপুরায় রামকৃষ্ণ মিশনের তিনটি শাখা ছিল সেই সময়ে, অথচ ভক্তদের জন্য সেই অর্থে বড় কোনও প্রার্থনামন্দির ছিল না ঠাকুরের। যা ছিল, তা প্রতিটি শাখার নিজস্ব, ছোট ঠাকুরঘর – জনসমাগম ধারণ করার অনুপযুক্ত।
আগরতলা মিশনের তখনকার সেক্রেটারি স্বামী পূর্ণাত্মানন্দ জী-র মনে হলো, একটি প্রার্থনাগৃহ করবেন সর্বসাধারণের জন্য। সেই নির্দিষ্ট খাতে অনুদানের আবেদন জানানো হলো মানুষের উদ্দেশ্যে; জমি দেখা হলো। কিছুটা অর্থ জোগাড়ের পর অল্প অল্প করে সে বাড়ির কাজও শুরু হলো। প্রার্থনাগৃহ তৈরির প্রাঙ্গনেই মিশনের অস্থায়ী ক্যাম্প অনুদানের জন্য খোলা থাকতো সারাদিন। অন্যান্য মহারাজদের সঙ্গে প্রায়সময়ই উপস্থিত থেকে অনুদান গ্রহণ করতেন, কাজকর্মের গতিপ্রকৃতি দেখতেন পূর্ণাত্মানন্দ জী।
এমনই একদিনের ঘটনা। বিকেল হয়ে এসেছে; আর হয়তো ঘন্টাখানেকের মধ্যে দিনের কাজ ফুরোবে, সবাই ফিরে যাবেন যার যার শাখাকেন্দ্রে। অনুদানের ক্যাম্পে পূর্ণাত্মানন্দ জী বসে তাকিয়ে আছেন দূরে – এতদিনে বোধ হয় সফল হতে চলেছে ত্রিপুরায় একটি প্রার্থনাগৃহের স্বপ্ন। কত অগনিত ভক্ত তিনটি শাখায় আসেন ঠাকুরের কাছে, মায়ের কাছে; অথচ শান্তিতে দীর্ঘক্ষণ বসে জপ বা ধ্যান করার, বা কেবল তাঁদের তিনজনের ছবির দিকে তাকিয়ে থেকে শান্তি অনুভবের সুযোগটুকুও কারো হতো না। এবার বোধ হয় ঠাকুরের ইচ্ছায় সেইসব হবে।
অনুদানের টেবিলের সামনে ইতোমধ্যে এসে দাঁড়িয়েছেন এক প্রৌঢ়া – মলিন, জীর্ণ শাড়ি গায়ে জড়ানো, গালে কপালে অসংখ্য বলিরেখা, হাতের আঙুলের ডগাগুলি ফুটিফাটা। দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছেন, কারো আসার। পূর্ণাত্মানন্দ জীই এগিয়ে এলেন।
– বলুন, মা, কিছু কথা ছিল?
মহারাজের দিকে তাকিয়ে বার্ধক্যের ছোঁয়া-লাগা কম্পিত, কিন্তু আনন্দী স্বরে প্রৌঢ়া বললেন, "শুনলাম আমার আল্লাহ-র জন্য একটা ঘর করছো তোমরা, বাবা?"
মহারাজ স্মিত হেসে বললেন, "হ্যাঁ করছি তো। ওই যে, ঘর তৈরি হচ্ছে তাঁর।" কথাটি ভুল নয়; কারণ ত্রিপুরার এই প্রার্থনাগৃহটি 'সর্বধর্ম উপাসনালয়' নামেই পরিচিত হয়েছিল।
প্রৌঢ়া সেদিকে দু পলক দেখে, আবার মুখ ফিরিয়ে বললেন, "আল্লাহ-র জন্য কিছু দিতে চাই তোমাদের। নেবে?"
– কেন নেবো না, মা? এখনই দেবেন?
ঘাড় নাড়েন প্রৌঢ়া। নিজের কোঁচড় থেকে একটি পলিথিনের প্যাকেট বার করে রাখেন টেবিলে। ভিতরে কেবল খুচরো পয়সা ভরা। একটু হকচকিয়ে যাওয়া মহারাজের মুখের দিকে তাকিয়ে প্রৌঢ়া বলেন, "দেড়শ টাকা আছে বাবা। একটু গুনে নেবে?"
নিজে রসিদ নিয়ে বসে, এক ব্রহ্মচারীকে ডাকেন পূর্ণাত্মানন্দ জী। প্যাকেটটি দিয়ে বলেন, "ভিতরে গিয়ে গুনে এসে exact amount-টা জানাও। মায়ের রসিদে লিখবো।"
কিছু পরে ব্রহ্মচারী মহারাজ এসে জানান, একশ-বাহান্ন টাকা। রসিদে সেটি লিখে নিয়ে, এবার প্রৌঢ়ার দিকে তাকিয়ে মহারাজ বলেন, "নামটা বলুন, মা।"
– জাহানারা খাতুন।
মহারাজ লেখেন। "আর ঠিকানাটা কী লিখবো?"
– ঠিকানা তো নেই বাবা আমার।
মহারাজের কলম থামে। "বুঝলাম না। 'নেই' মানে? আপনি কোথায় থাকেন?"
– রাস্তায় থাকি। আজ এখানে, কাল সেখানে। আমি ভিক্ষা করি, বাবা। এখন সূর্যনগর থেকে আসছি। আমার শেষ কিছুদিনের ভিক্ষা থেকে একটু একটু করে জমিয়ে যা পারলাম, দিলাম তোমাদের।
বাক্যহারা, প্রায় স্থাণু হয়ে যাওয়া মহারাজের এর উত্তরে অপ্রস্তুত কৃতজ্ঞতার একটি হাসি ছাড়া আর কীই বা দেওয়ার ছিল? আশ্রমের অনুদানের রসিদে একটি নাম লেখা রইল, "জাহানারা খাতুন। ভিখারিনী, সূর্যনগর। একশত বাহান্ন টাকা।"
[ঘটনাটি এটুকুই। পূর্ণাত্মানন্দ জী স্মৃতিচারণ করছিলেন 'উদ্বোধন' পত্রিকার ১২৫তম বর্ষপূর্তির অনুষ্ঠানে, গিরিশ মঞ্চে। এতদিন পরেও, তাঁর মনে পড়ে, স্বয়ং শ্রীশ্রী মা সেইদিন এসেছিলেন ভিখারিনীর বেশে, ধর্ম-সমন্বয়ের আদর্শটিকে সার্থক করতে।]
Comments
Post a Comment