ব্যাকুলতা
কী আছে সামনে, জানি না। অবশ্য একেবারে জানি না বললে ভুল বলা হবে। কিছুটা তো জানিই। বালিঘড়ির মতো বছর ঘুরবে, চামড়ায় ভাঁজ দেখা যাবে, চুল আরও পাকবে আর পড়বে, নতুন নতুন অসুখ শরীরে আসবে অতিথি হয়ে – থেকে যাবে, বা কদিন কাটিয়ে চলে যাবে অন্য কোথাও। স্বপ্নের, উচ্চাকাঙ্খার বিরাট গ্যাসবেলুন মেলার মাঠে উড়ে বেড়ানো সাবানজলের বুদ্বুদ হয়ে আসবে। তারপর একদিন, যত আগে থেকেই প্রস্তুতি নিই না কেন, কিছু কাজ এবং অনেক কথা বাকি রেখে – ফুসমন্তর! ছাই।
এতটা জানি – দেহের 'কৌমারং যৌবনং জরা'র গল্প। চলমান শরীরে মহাকালের লাইটহাউজের আলোটি ঘুরতে ঘুরতে এক একবার যখন এসে পড়ছে, দেখছি এই সব দৃশ্য। কিন্তু যা দেখতে পাচ্ছি না, জানছি না, তা হলো – এর মাঝের ড্রপসিনগুলিতে কী করছি আমি? কে কে আছে আমার সঙ্গে? কার কার সঙ্গে আছি আমি? কার প্রস্থানের ঘন্টি কখন বাজছে? আমি কি তা শুনতে পাচ্ছি? শুনে কিছু করতে পারছি? প্রতিটি নতুন অঙ্ক পেরিয়ে যেতে যেতে আমি কি একটি – কেবল একটি মানুষের দিকেও চোখ রেখে বলতে পারছি, এঁকে আমি শুধুই সদর্থ নিবেদন করেছি সারা জীবন? অনবধানের বেসুরগুলি কি আবার সুরে লাগছে? সেরে উঠছে? সারিয়ে তুলছি আমি? দিন থেকে দিন পেরোতে অনিশ্চয়তার প্রশ্নগুলির উত্তর নিজমনে সাজাতে সাজাতে, ক্লান্ত হয়ে প্রেমহীন, আশঙ্কিত হয়ে পড়ে আছি আমি, মাঝপথে। হয়তো আরও কেউ।
এসবের মাঝে – তখন বিকেল, হয়তো বা চারটে পঞ্চান্ন। দিনের কাজে দাঁড়ি টেনে আপিসে চাবি দিয়ে বেরোচ্ছি। শীতের শেষে রুক্ষ, রূঢ় বাতাস সূর্যাস্তের মুখে কিছুটা করুণাময়। সে বাতাসে তেতে-পুড়ে যাওয়া ছাতারে পাখির দিনান্তপালক কেঁপে ওঠে একবার, দুবার। সেই দেখে আমার তোমার কথা মনে পড়ে।
কেন মনে পড়ে এমন অসময়ে, অস্থানে তোমার কথা? সে আমারও জানা নেই। যেখানেই সহজ, যেখানেই সত্যনিষ্ঠ বেঁচে থাকা, আমার চোখে সেখানেই তুমি। মেটে সুরে, মেঠো কথায় তোমার আদেশেও এত প্রশ্রয়? তোমার নিষেধেও এত প্রেম? তোমার জন্য সেজোবাবুর বাগানে এক ডালে দু-রঙের ফুল ফোটে; তুমি কেবল বলো, "গাছের পাতাটিও তাঁর ইচ্ছা ছাড়া নড়ে না।" ঘাস দলিত হলে তোমার দেহের তন্তুজাল ছিঁড়েখুঁড়ে যায়; তুমি শুধু বলো, "তৃণটিকেও ঘৃণা কোরো না।"
তোমার সন্তান তোমায় লেখেন, "চির-উন্মদ প্রেম-পাথার"। সেই পাথার নিয়ে বসে আছো তুমি – আমাদের মতো প্রেমহীন সকলের জন্য। চোখদুটি কৃপায়, করুণায় অর্ধোন্মিলিত। তোমার রাগ নেই, বিরক্তি নেই, ধৈর্য্যচ্যুতি নেই। না চাইতে পাশে আসো, হাত ধরো, অনুযোগের সুরে বলো, "একবার আন্তরিক ডাকো, ব্যাকুল হয়ে।" তোমাকে স্মরণ করার কোনও সময়ই অসময় নয়, কোনও স্থানই অস্থান নয়।
এত অনিশ্চয়তার আধো-অঙ্গীকারের মধ্যে নিরবচ্ছিন্ন ব্যাকুলতাকে নিশ্চিত বলে জানিয়েছো তুমি। তবু পারি কই? সুখে নিজের বিভায়, দুঃখে নিজের অন্ধকারে – অন্ধ হই। আন্তরিক তোমায় আর ডাকা হয় না আমার।
Comments
Post a Comment