প্রশ্নোত্তর খেলা
একা থাকি বা কারো সঙ্গে, নিজে নিজে কথা বলে চলি সারাক্ষণ। নিজেকে প্রশ্ন করি – জীবন বদলে দেওয়া দার্শনিক প্রশ্ন নয়। ছোট ছোট, মজার প্রশ্ন। নিজেই উত্তর দিই।
পাশের বাড়ির ভদ্র-কাকু এসেছিলেন সকাল সকাল, সদ্য ঘরে হয়ে যাওয়া মার্বেলের মেঝে দেখতে। দূর থেকে দেখেই, নাকটা অল্প কুঁচকে বললেন, "পাথরটা ভালো নয়! ঠকিয়েছে তোমাদের!" চুপ করে রইলাম। বললেন, "কোনও ডিজাইন-ফিজাইন কিস্যু নেই!" চুপ করে রইলাম। বললেন, "পাথর দেখেছিলাম উদয়পুরের। দেখে চোখ ফেরানো যায় না।" শুনে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করলাম –
আজ যদি এই পাথর না বসিয়ে উদয়পুরের পাথর বসাতাম, আমার পক্ষে ঠাকুর-মা-স্বামীজীর দেখা পাওয়া সহজ হতো কি?
- মানে?
- মানে, এখন যে পাথরের মেঝেয় হাঁটছি, সেই মেঝেয় হেঁটে আমার ঠাকুরকে পাওয়ার চান্স যতটা, উদয়পুরের পাথরে হাঁটলে কি বাড়ত একটু?
- ধুস! সে আবার হয় নাকি... কী যে বলিস!
- তাহলে গোটা ব্যাপারটাই আমার কাছে অপ্রাসঙ্গিক।
- কিন্তু এই পাথরের চেয়ে better হতো! ঘরটা দেখতে সুন্দর হতো আরও।
- ঘরটা দেখতে সুন্দর হলে কি আমার ঠাকুরকে পাওয়ার চান্স বাড়ত, এখন যা আছে তার চেয়ে?
- উফ, তা নয়...
- পুরো ব্যাপারটাই সে ক্ষেত্রে অপ্রাসঙ্গিক।
- কিন্তু উদয়পুরের পাথরের দামে সস্তা পাথর বেচলো তোকে! ঠকলি তো!
- না ঠকে, ওই টাকাটুকু বাঁচলে, ঠাকুরকে পাওয়ার চান্স বাড়ত এখনের চেয়ে?
- বেকার ইয়ার্কি ভাল্লাগে না কিন্তু।
- সে ক্ষেত্রে ব্যাপারটা অপ্রাসঙ্গিক আমার কাছে। এর চেয়ে ভালো মার্বেল যা, খারাপ মার্বেল তাইই। আরেকবার টাইলস বসলে তাইই। নীট সিমেন্টের কাজ হলেও তাই।
ঘুরে ফিরে আমার নিজেকে প্রশ্ন এটুকুই এখন। যা করছো, যা ভাবছো, যা পাচ্ছ, যা চাইছো, যাদের সঙ্গে আছো – তারা কি তোমাকে ঠাকুরের অভিমুখে ঠেলছে? না নিজেদের দিকে টানছে – পদ, সম্মান, অহংকার, খ্যাতি, যশ?
বস্তুগত জগতে যা কিছু নিয়েই নিজের সঙ্গে এই প্রশ্ন-উত্তর খেলা খেলি, দেখি জড় যা কিছু সবই অপ্রয়োজনীয়, অপ্রাসঙ্গিক। রোল খেতে ইচ্ছে করছে, কিন্তু দোকান বন্ধ। মুড়িমাখা খেতে হলো।
রোলটা পেলে ঠাকুরকে ছুঁতে পারতাম?
না।
তাহলে কী রোল, আর কীই বা মুড়ি!
খুব ইচ্ছে, ক্লাসে এলিয়ট পড়াবো, কিন্তু পেলাম মিলটন।
এলিয়ট পেলে সারাদিনের শেষে স্বামীজীর সঙ্গে বসে হুঁকো খেতে পারতাম?
না।
তাহলে মিলটন কী দোষ করলো?
কাঁসার থালায় খাই, আর বোনচায়নার প্লেটে – খাচ্ছি তো সেই ভাত, যাচ্ছে তো সেই পেটেই। থাকলে, ঠাকুর এর সবেতে আছেন, নাহলে এর কিছুতেই নেই। হ্যাঁ, ইচ্ছে অনিচ্ছের জোর নিশ্চয়ই আছে, প্রয়োজনীয়তাও আছে। সাধ এলে, সাধ্য থাকলে মিটিয়েও নিচ্ছি। কিন্তু মিটছে না যখন, প্রশ্ন করছি। এবং প্রতিবারই উত্তর পাচ্ছি, মুড়ি হোক বা মিলটন, রোল হোক বা এলিয়ট – ঠাকুরের পথে আমার থাকার ক্ষেত্রে এদের ভূমিকা সমান। থাকলে, এইসব ব্যতীতই থাকবো; না থাকলে, এর কোনোটাই রাখতে পারবে না আমায়।
বরং মানুষের ক্ষেত্রে প্রশ্ন করি যখন নিজেকে, উত্তরে বৈচিত্র্য আসে। রোল বা মুড়িমাখার মতো অপ্রাসঙ্গিক লাগে না।
অমুক মানুষ/মানুষেরা আমার জীবনে থাকায় ঠাকুরের অভিমুখে আমার গতি বেড়েছে? হ্যাঁ, বেড়েছে।
অমুক মানুষেরা জীবনে না থাকায় ঈশ্বর-বিরুদ্ধ পথে আমার চলাচল কমেছে? হ্যাঁ কমেছে।
অমুক মানসিকতার মানুষেরা না থেকে তমুক মানসিকতার মানুষেরা থাকলে আমি ঠাকুরকে আরও বেশি স্মরণ করতে পারবো? হ্যাঁ পারবো।
আচ্ছা, এমন সমমনস্ক মানুষেরা আমাকে ঠাকুরের সঙ্গে সাক্ষাৎ করিয়ে দেবেন? না, দেবেন না। সাক্ষাৎ শেষে গিয়ে যদি হয়, যার যার নিজেরই অধ্যবসায়ে হবে। কিন্তু সাক্ষাতের পথে চলাটাও তো এক ধর্ম। সেই ধর্মে এইসব মানুষেরা আমায় রাখবেন।
তাই, সময় নিয়ে, ধৈর্য্য নিয়ে মানুষকে বেছে নেওয়ার চেষ্টা করি। কারণ, তাঁদের থাকা না থাকায় ঠাকুরের পথে আমার থাকা জড়িয়ে আছে। মানুষের মন ভারি সুন্দর – আমাকে বদলে দেয়, আমিও বদলে দিই। এমন মনেরা একজোট হয়ে যেন একে অন্যকে সাজায় একটু একটু করে। সাজায়, মনে না ধরলে মুছে ফেলে আবার সাজায়। সাজায় আর নিজেও সেজে ওঠে। এই সেজে ওঠাই এগোনো, সাক্ষাতের দিকে। হাতে হাত রেখে, বেঁধে বেঁধে থাকি এই মনেদের সঙ্গে।
আর ত্যাগ করি কাকে? আমার ও অন্যের যা কিছু ঈশ্বরাভিমুখে সম্ভাব্য diversion, তাকেই। সমাধানহীন সমালোচনা, পরচর্চা, পরনিন্দা। স্বামীজী বলেছিলেন, "whatever does not lead you godward, reject as poison." এতটা পারি না এখনও, স্বামীজী; জড়িয়ে পড়ি এসবে। কিন্তু এতটুকু বুদ্ধি হয়েছে মনে রাখার মতো যে এই স-অ-ব বিষ। বিষে পড়ছি, বিষে জড়াচ্ছি। অমৃত বলে অন্তত ভুল করি না আর।
আচ্ছা, এই সমমনস্ক মানুষেরা যদি একদিন সরে যায় দূরে, ভুল বোঝাবুঝিতে?
- এতদিন অব্দি হয়েছে কি সেরকম?
- না, অন্তত এখন দাঁড়িয়ে দেখলে মনে হয় না।
- মনে হবেও না। আগে যার যার চলে যাওয়া নিয়ে ব্যাকুল হয়েছিলাম, অমৃত হারালাম ভেবে কেঁদেছিলাম, পরে দেখেছি সেই ফাস্ট ফুড সেন্টারের অমৃত খেয়ে আর যা কিছু হোক, মায়ের শ্রীচরণ পাওয়া হতো না। আর ভুল বোঝাবুঝি? সে বড় ঠুনকো জিনিসে হয়। যদি মন দড় হয়, ঠাকুর বাদে বাকি সব তার কাছে ক্ষণিকের মাত্র। ওইসব নিয়ে ভুল বোঝাবুঝি সে করবে না। ঠাকুর বলতেন, "নাচতে শিখে গেলে, যতই যা করো, পা আর বেতালে পড়বে না"। ওই মুড়ি-মিলটনের মতোই অপ্রাসঙ্গিক হয়ে যাবে সব ভুল বোঝার সুযোগ। আর যদি ভুল বোঝাবুঝি আসে, জানবো মন পাকেনি – আমারও, তারও। অতএব, "reject it as poison!"
এই শরীর দু'দিনের। জাদুকরের শ্রেষ্ঠতম ভোজবাজি বই আর কিছু নয়। আজ আছে, কাল যাবে। বড়জোর পরশু। শরীর যাবে, মন যাবে, স্মৃতি যাবে। আবার শরীর আসবে। সে-ও যাবে। কিন্তু থেকে যেতে হবে আমাকে। বুঝতে হবে – প্রথমে তোমাদের, তারপর তোমায়। কিছুটা করে বুঝবো, তারপর ভুলিয়ে দেবে তো? দাও। দেখি, কত জোর তোমার। আবার শরীর দেবে যখন, আবার বুঝবো। যতবার দেবে, ততবার। চাকরি, ডিগ্রি, মান সব গোল্লায় যাক; আমি তোমাকে বুঝে ছাড়বো। এখন বুঝি না, কিন্তু ভালোবাসি। তোমার কথা বলতে চাই, তোমার কথা লিখতে চাই, শোনাতে চাই তোমার গান। তোমার জন্য কাজ করতে চাই। যে ভাবে হোক, তোমায় বুঝবো। প্রতিবার ভুলিয়ে ভুলিয়ে আমায় ঠেকাতে পারবে না। কারণ, আমি তোমার শরণাপন্ন।
এইটুকু কোরো, যেন প্রতিবারই শরীর নিয়ে তোমাকেই খুঁজি, যেন সঙ্গীদের, সঙ্গিনীকে তোমার ঘরের পথ দেখাই, আর সেই শরীরেই যেন তোমায় দেখে যেতে চাই, আর দেখা না পেলে যেন এটুকু অনুভব থেকে যায় যে আমাদের দেখা হওয়া বাকি আছে এখনও।
বুঝি বা না বুঝি, এইই আমাদের একমাত্র লক্ষ্য।
Comments
Post a Comment